“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ১

 





একটা সময় এই জায়গায় ছিল সারি সারি মাঠের ক্ষেত। চাষারা এখানে ধান চাষ করত। কত সাহেব-নবাব-সিরাজুদোল্লা থেকে আমাদের বাংলার কত মনীষী,কত প্রিন্স এই মাটিতেই রাজ করে গেছেন। এই শহরের বয়সও কম নয়। ইতিহাস-ক্ষত-রক্ত-যুদ্ধ ও সংগ্রাম হয়েছে এই শহরের বুকে। কান পাতলে আজও হয়তো শোনা যায় কত আওয়াজ। চিৎকার। আর্তনাদ। এখানকার ট্রাম নাকি ঘোড়ায় টানতো। রাস্তায় টম টম গাড়ির আনাগোনা ছিল।রাতের অন্ধকারে রাস্তা পাহাড়া দিত কেরোসিন বাতির পোস্ট।এক্কা গাড়ি। কত বনেদিয়ানার বাড়ির ইট এখন সময়ে সময়ে হুড়মুড় করে ভেঙেপড়ে। ছোট ছোট গলি পথের ম্যানহোলে জমে কত ময়লা,আবর্জনা আরও কতকি। বহুযুগ পেরিয়ে এই শহরের বুকে লেখা হয়েছে মানবজাতির সংগ্রাম। লেখা হয়েছে কৃতিত্বের ইতিহাস। কে জানে কত মানুষ,তারমধ্যেই লুকিয়ে ছিল আমাদের কোনো চেনা চরিত্র। কোনো চেনা মানুষ।যার জীবনের তাগিদে চলে আসা এই শহরে। এখানে বর্ষার জলে শহর তলিয়ে যায়।আধুনিকতার আস্ফালনে মাটির ভেতর চিরে চলে যায় মেট্রো।তিনশো বছরের বেশি ইতিহাস নিয়ে বয়ে যায় শহরের শামুক গতির ট্রাম। পেছনের লেজ দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঝোলানো তার স্পর্শ করতে করতে চলে যায়। চলচ্চিত্রের কোন পরিচালক সেই তারে লেজ ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করে নেন।কয়েক কোটি মানুষের ভিড়ে একটা চরিত্র হেঁটে যায়। একটু ঝুঁকতে ঝুঁকতে শিরদাঁড়া তার আর সোজা হয় না। তবুও হাঁটে।আর প্রতি পদক্ষেপে কোন এক নাগরিককে বলে মহানগরের জীবন।”

পর্ব-
আবহাওয়ার খবরে বলেছিল আগামীকাল আকাশ থাকবে আংশিক মেঘলা। তবে সন্ধের পর ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। খবর শুনতে শুনতে নীলাদ্রি ওর মাসিকে বলল,দরজাটা দিয়ে দিও। ভেতর থেকে মাসি বলল,ছাতাটা সঙ্গে রাখতেই তো পারতিস। খবরে বলল,ওবেলায় ঝড় জল হবে। মুখে একটা না গোত্রের ইঙ্গিত করে বেরিয়ে গেল বাড়ির গেট দিয়ে। নীলাদ্রি ব্যানার্জী। বি.এ সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। তবে এখন কলেজ না করে সোজা কাজে। কলকাতার বাগুইহাটি অঞ্চলে থাকে। সেখানেই ওর মাসিরবাড়ি। মেসো চাকরি করেন একটি ফ্যান কোম্পানিতে। দীর্ঘ পঁচিশ বছর চাকরির সুবাদে প্রায় তিনি এখন একটা জোনালের প্রায় ম্যানেজার গোত্রের। অনেক স্টাফ কর্মী নিয়ে তাঁর কাজকর্ম। বিপুল দাস। বয়স পঞ্চান্ন ছাড়িয়েছে। খোশ মেজাজে থাকেন। মুখে সর্বদায় গোপাল-শুরভি পান। মাঝে মাঝে ব্যস্ত শহরের মধ্যে ফাঁক ফোকর পেলেই মুখ থেকে পিক ফেলে মুখ হালকা করে নেন। বাড়িতে মন বেশি বসেনা। আমাদের কলকাতার বিখ্যাত মোড়। কাদাপাড়া। সেখানেই তাঁর জন্ম থেকে শৈশব কেটেছে। আবার বরাত ভালো যে নিজের পাড়াতেই চাকরি পেয়েছে। তাই অফিস সেরে ভাই-বোন,ভাই-পো-ভাই-ঝি করে বাড়ি ফেরেন। এদিকে স্ত্রী সর্বদায় ভাবেন সংসারে তার স্বামীর একদম মতিগতি নেই। এমনকি এই বুড়ো বয়সে দুজন দুজনকেই সন্দেহ করে। এবং এও মাত্রাতিরিক্ত। এরই মাঝে ফ্যাসাদে নীলাদ্রি।

সকাল সাত টায় নীলাদ্রি ঘুম থেকে উঠে পড়ে। ব্রাশ করা। বাড়ির সবার জল তোলা। সবার মুখে মুখে চা পৌঁছানো। মশারি খোলা। মাসির ছেলের মুখে চা এনে দেওয়া। যদিও তার ঘুম ভেঙে যায়,তাহলে তার একটু গা-হাত টিপে দেওয়া। ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে সাত ছোঁয়। আবার নিচ থেকে মাসির,হ্যারে মশারি গুলো খুলেছিস? আর আজ বৃহস্পতিবার, চান করে ঠাকুরকে জল বাতাসা দেওয়ার আগে,আল্পনাটা দিয়ে দিস। তড়িঘড়ি করে ও নিচে চলে আসে। মাসি হয়তো ততক্ষণে রান্নাঘরে কিছু একটা চাপিয়েছে। ঝট করে চান সেরে, উঠে যায় তেতলার ঘরে। বিরাট মাপের একটা ঠাকুর ঘর। ব্রহ্ম জগতের সব দেবতার মূর্তি-ছবি আছে সেখানে। গামছা ছেড়ে ও পরে নেয় ধুতি। ঘড়ির কাঁটা পৌনে আটে। মিনিট দশের পুজো। তাতে সাতটা শিলাকে ঘি মাখিয়ে চান, আটটা থালায় নকুলদানা আর জল দেওয়া। এরপর সংকল্প। শঙ্খ বাজানো। সেরেই সে চলে আসে দোতলায়। ঘড়ির কাঁটা আটে। এরই ফাঁকে মাসি বলল, হ্যারে ধুনোটা দিলি না। ভুলে গেছিস? আচ্ছা থাক আমি দিয়ে দেব। এরপর কোন রকমে নাকে-মুখে গুঁজেই ছোট ছোট। বাড়ি থেকে বেরিয়েই অটো। তারপর বাস। সেই বাসে করে আপোলো হসপিটাল মোড়। হাতে একটা টিফিনের কোটো। তাতে রুটি তরকারি। জামা প্যান্ট ফরম্যাল। বাসের ভাড়া আট টাকা দিয়েই ও নামল কাদাপাড়া মোড়ে। নীলাদ্রি বাস থেকে নেমেই রাস্তা পার হয়। পার হয়ে যে রাস্তাটা ফুলবাগান বরাবর এগোচ্ছে সেদিকের অভি মুখেই এগিয়ে যায়। প্রথমে স্বভূমি প্লাজা ফেলে,এইটটি নাইন সিনেমা ফেলে একটু এগিয়েই ডান হাতে একটা কাদা জলের গলি। সেখানে বারো মাস লোহা-লক্করের জল,তামার জল,ব্যাটারির জল আরো এটা ওটা করে কত জল। সব পেরিয়ে পেরিয়ে ও অফিসে ঢোকে। অফিসের গেটের বাম দিকের রাখা মালিকের গাড়ি। রঙ লাল।

সোহম, শিশির, টুলু, পটা সবাই এসে ততক্ষণে বেশ কয়েক হাত মেশিন ঘুরিয়ে নিয়েছে। নীলাদ্রি কে ওরা সবাই নীলু বলে ছোট করে ডাকত। সোহম বলল,কি হোল নীলু এতো লেটে? ন'টা বেজে গেছে। দশ হয়ে গেল। কোন রকমে কথা এড়িয়ে যেতে বলত সে,এইতো বাস টা এটি লেট করল যে...কী আর বলি। শুনে সোহম বলে,বড় বাবু ওপরে। ওদের অফিসের সবাই মালিককে বড় বাবু বলে ডাকে।

এই ফাঁকে একটা কথা বলে রাখি আমি এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। অফিস নাম করে যে কথাগুলো বললাম, সেই অফিস আসলে একটা কারখানা। এটা একটা আলাদা জগৎ। এখানকার মানুষেরা খুব পরিশ্রমী।তাঁদের কোন বাছবিচার নেই। নেই কোন ফাঁকির জায়গা। প্রায় কারখানার আশি শতাংশ স্টাফ আসতো পাশের লোকালয় থেকে, ফলত দুপুরের খাওয়াটা সারতে একবার সবাইকেই বাড়ির দিকে যেতে হয়। যাওয়া হতোনা নীলাদ্রির। টিফিনে হাত মুখ ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে,ও বসে যেত খাবার খেতে। খাবারের মধ্যে দুপুরে রুটি ওর পছন্দ হতোনা। তাই যেদিন যেদিন অন্ততঃ একটু তেলে স্যাকা পরোটা হাতো সেদিনই একটু বেশি তৃপ্তি হতো।

এখানেই থাকতো ফ্যাক্টারির জামা প্যান্ট। আসলে এই ফ্যাক্টারিতে আমাদের বাড়ির পাখার কয়েল তৈরি হতো। যে কর্মী বা শ্রমিক বেশি বানাতে পারবে,তার মাসিক সংখ্যার হেরফেরও হবে কিছু বেশি। তাই কাদাপাড়া মোড়ে নেমে ভদ্র-জামা ইন করে, জেন্টেল হয়ে, এই অফিস নামক একটা খাঁচায় এসে যেত সেখানেই চলত লড়াই।

আজ সেইরকমই একটা ব্যস্ততার দিন। সকাল সকাল ম্যানেজার নোটিস করেছে হেড অফিসে চাপ আছে। আজ এক ঘন্টা এক্সট্রা ডিউটি আর সাথে সাথেই বোনাস।আজই নীলাদ্রি বাড়ি যাবে। ফেরার ট্রেন রাত ন'টায়। প্রতিদিন ওর মেসো ওকে কুড়ি টাকা দিত যাতায়াতের খরচ। এটা একদিকে বাঁচোয়া।তানাহলে সর্বনাশ। বাড়িতে আসবে তার কারণ,দু একটা কজকর্ম আছে।তাই একটা দিন বেশি ছুটিও নিয়েছে আগামীকালের জন্য। ওদিকে বাড়িতে আসাও একটু বিপদের। এসেই দেখবে চাল-ডাল-অনাজ-পাতির টান পড়েছে। তাই বকসিসের টাকাটা পেলেও শান্তি।কিন্তু বকসিস? সেতো আগে কাজ উঠুক। এদিক ওদিক করতে করতে প্রায় বিকেল গড়িয়ে এবার সন্ধ্যে। টুকটাক টিফিন হলো পকেটে কিছু খুচরো পয়সা দিয়ে। মালিক ম্যানেজারকে ডেকে কি একটা বলে গেটের সামনে উঠে দরজা বন্ধ করে। কাদাজল পেরিয়ে গাড়ি বড় রাস্তা নিল।কৌতূহল বশত নীলাদ্রি র একটু চিন্তা হলো। হ্যা অমনি ম্যানেজার এসে বললো,আজ বকসিস হবে না। দুদিনের মধ্যেই হবে। বিরাট একটা আশা হতো হবার পর মনের যেরকম অবস্থা হয়, ওরও ঠিক তেমনই হলো। মালিক চলে গেল তখন ঘড়িতে সাড়ে সাত। তারওপর সে আর আশা রাখতে পারল না। মোবাইলে দেখল কলেজের দু'একজন ফোন করেছে। ম্যামের এস.এম.এস. এসেছে। তাড়াহুড়ো করে সে বাথরুমে ঢুকল।কারখানার বাথরুমে যা অবস্থা হয়, এরও ঠিক তেমনটাই। চারিদিকে মাকড়সার ঝুল, কালি, মাটির মোটা আস্তরণ। স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালে আরশোলা হেঁটে বেড়াচ্ছে। শ্যাওলা পড়েছে চৌবাচ্চায়। মগটাতেও জলের আয়রণ ধরেছে। বেরিয়ে এসে,ঢোকার সময় ছাড়া জামা-প্যান্ট আবার একটা অফিসবাবুর কলিগের মতো পড়েনেয়। কারখানার দরজার ডানদিকের দেয়ালে থাকতো একটা আয়না, সেখানেই চুল আঁচড়ে নিত।

কারখানা থেকে বেরিয়ে সোজা একটা হাঁটা। এই হাঁটা ওর সংগ্রামের। এরপর আসে ফুলবাগান। ফুলবাগানে এসে একটু ভাবত জিরিয়ে নেব। কিন্তু সে ফুরসৎ পেত না। এদিকে শিয়ালদা আসতেও অন্তত আধ ঘন্টা সময় লাগবে নীলাদ্রির। পকেটে হাত দিয়ে দেখল,ঘামে ভেজা শুধুমাত্র একটা দশ টাকার নোট পড়ে আছে। ওদিকে ট্রেন সময় মতো না ধরলে গঙ্গা পার হওয়াটা অনেক অনেক বিপদের। কাড়াপাড়া থেকে সোজা ফুলবাগান। সেখানে নারকেলডাঙ্গা মেন রোড ধরে আবার হাঁটা। কত অটো পাস দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ হাঁক দিচ্ছে শিয়ালদা শিয়ালদা।এসব কিছুকেই যেন অনাসায়ে উপেক্ষা করে লম্বা হাঁটা। ফুলবাগান ফেলে রাজাবাজারের মোড়ের আগেই নারকেল ডাঙ্গা ব্রিজ বেয়ে বা'হাতে শিয়ালদা রেল কোয়ার্টার হয়ে বেরিয়ে আসতো। সারা সাদা জামা ঘামে ভিজে এঁটে গেছে। ঘড়িতে আট'টা বেজে পঞ্চান্ন। গলা শুকিয়ে যায়। তেষ্টা পায়। একবার ভাবে যদি একটা কেক। তারপরই ভাবে, না থাক। ভেজা নোটের কথা মনে পড়ে। এক ছুটে এসে ধরে নেয় ট্রেন। একটা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে যেত একান্তে। সন্ধে থেকে আসা এস.এম.এসের এলোমেলো উত্তর দিতে দিতে
পৌঁছে যেত বাড়ি।

Comments

আরও পড়ুন

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ৩

তৃতীয়— মাস-সংক্রান্ত

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ২

জুজুতন্ত্রের সমূহ শ্বাপদ এবং হুজ্জতি

সাম্য রাইয়ান— নির্বাচিত একক সংখ্যা

রঙ্গন রায়

গুচ্ছ কবিতা —

লিটল ম্যাগাজিন ও ফিনিক্স মিথ

অংশুমান কর