পল্লব গোস্বামী'র একগুচ্ছ কবিতা: বাউন্ডুলের চিঠি | এবং
(পাঁচ)
যে ট্রেন আর থামবে না কোনোদিন, সেই ট্রেনের জলভর্তি কামরায় কীভাবে যে আমি ঢুকে পড়েছি নিজেই জানিনা ! নক্ষত্রদের মতো ছুটে চলেছে ম্যাজিক ট্রেন। দু'পাশারি খসলার ক্ষেত, মিশকালো বাবলার বন। দূরের পাহাড়ে কেউ যেন আগুন জ্বেলে দিয়েছে মনে হচ্ছে। জ্বলছে আমার কাছের মানুষটিও। এমন জ্বলন এড়িয়ে আমার খালি মনে হচ্ছে, এখানে একটি নোঙর হলে খুব ভালো হতো। খুব ভালো হতো যদি থাকতো, একটি খেয়াঘাট, আকাশ ধোয়া জল। এই জলই তো আমার মায়া সোনাই। তুমি কি জানোনা এই জল দিয়েই রোজ আমি তোমার পা ধুইয়ে দিই ?
জলকে যে আমি বড়ো ভালোবাসি,
যেকোনো পাহাড় গড়িয়ে নেমে আসা, খুঁট ভেজা মানুষের চোখের জল।
(ছয়)
তুমি কি জানো, কেমন থাকে ভালোবাসার মানুষ অপমানের পর ? কেমন থাকে, অনাদরের মানুষ বারবার লাথি খেয়ে ? এসব কিছুই জানবে না তুমি। ছোটোবেলায়, এক জ্যোতিষী কুষ্ঠি বিচার করে বলেছিলেন, এ ছেলের লগ্নে চন্দ্র। জন্মছকে, প্রবল গ্রহণ দোষ। দশমে শনি। জাতক খুব দুর্বল, তবে কল্পনাপ্রবণ হবে। খুব কষ্ট পাবে আর শনির মতো জীবন হবে।
আশ্চর্জনকভাবে, শনির মতোই একটা জীবন ভেসে যাচ্ছে দেখো। এখন আর
তেমন কোনো পড়াশোনা নেই, পড়াশোনা অনুযায়ী কাজ নেই, কাজ করার মতো শরীরও নেই। অথচ, অনেকগুলো মানুষ আমাকে দেখে বেঁচে আছেন বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, একদিন শরীর হারায়, কবিতাও হারায়, ভালোবাসা হারায় না। তুমিই শুধু বুঝতে পারো না, চোখের জলে ভিজিয়ে রাখা প্রসাদী চিঁড়ের জাগরণ।
(সাত)
গতকাল ঘুমিয়ে পড়ার পর, দেখি মা আমাকে বাবা বাবা বলে ডাকছেন। এমন প্রায়ই ডাকেন। তারপর কপালে হাত বোলাতে বোলাতে ঘুমিয়ে পড়েন আমার কোলেই। তোমার কি মনে পড়ে সোনাই, ভালোবেসে তোমাকেও আমি মাঝে মাঝে মা ডাকতাম। এইসব ডাক এখন আমাকে স্বপ্নের ভিতর দিয়ে নিয়ে যায়। স্বপ্নে দেখি, মৃত দাদু আমাকে ডাকছেন। কী আকুলিপিছাড়ি সে ডাক ! তোমাকেও স্বপ্নে দেখি। যদিও, মুখ দেখানো আর হয় না তেমন।
সকাল হতেই এক আনকোরা ডাকহরকরা আসেন। দিয়ে যান, পৃথিবীর চিরকালীন দুঃখের কবিতা-বই। কবিতা পড়লে আমার কান্না পায় এখন। গান শুনলেও পায়। আমি জানি, ডাক এলে তা কখনো এড়ানো যায় না। এড়াতে নেই। তাতে অমঙ্গল হয়। তবু, কেন যে এত কষ্ট হয়, কে জানে !

Comments