
গভীরতর অন্বীক্ষায় লক্ষিত হয় বোদলেয়ারের অনুবাদে বুদ্ধদেবের নিষ্ঠা ও সংকল্প। এই অনুবাদযাত্রা পাঠক-বুদ্ধদেবের পূর্ণমনস্ক পাঠকৃতিরই এক আশ্চর্য অভিজ্ঞান। আর এক সমসাময়িক কবি, 'বিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি', উক্ত আখ্যায় যাঁকে অভিহিত করেছিলেন বুদ্ধদেব, সেই সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি তাঁর অনুবাদগ্রন্থের সূচনাপর্বেই নিঃসঙ্কোচে ঘোষণা করলেন, যেহেতু কবিতা 'উক্তি ও উপলব্ধির অদ্বৈত', তাই কবিতার রূপান্তর অসম্ভব; বোদলেয়ারের অনুবাদে উক্তি ও উপলব্ধির পবিত্র সমন্বয়সাধনের বিশুদ্ধ সংকল্পে বুদ্ধদেবের অনুবাদ-ইচ্ছাই কি কেবল প্রকাশিত হয়, না কি বিশ্বসাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠক বুদ্ধদেব আন্তর্জাতিক কবিতার এক অমোঘ যুগমুহূর্তের প্রতি শোধ করলেন তাঁর দীর্ঘদিনের ঋণ? বোদলেয়ার-পাঠে, র্যাঁবো-এর সেই মহাউক্তির ওপর ভরসা রেখেছিলেন বুদ্ধদেব: "Baudelaire is the first seer, king of poets, a real god!"। র্যাঁবো, বুদ্ধদেব বসু যাঁকে চিনে নিতে চেয়েছিলেন বোদলেয়ারের 'প্রথম সন্তানগণের অন্যতম' পরিচয়ে। শার্ল বোদলেয়ার কেন বিশ্বকবিতায় প্রথম দ্রষ্টা তার কারণও র্যাঁবো দাখিল করেছিলেন Paul Demeny-কে লেখা পত্রটিতে, যেখান থেকে প্রাগুক্ত উক্তিটি উদ্ধৃত করেছেন বুদ্ধদেব। র্যাঁবো-এর পাশাপাশি উল্লেখ করলেন ভের্লেন এবং মালার্মের প্রণতির কথা। মনে করিয়ে দিলেন, মালার্মেই প্রথম- তখন তিনি যুবক- একটি গদ্যকবিতায় প্রণতি জানিয়েছিলেন বোদলেয়ারকে, এবং ভার্লেন ঘোষণা করেছিলেন 'ফ্লর দ্যু মাল'-এর রচনারীতি 'অলোকিক শুদ্ধতাসম্পন্ন'। ইয়েটস-ও যে অগ্রসর হয়েছেন বোদলেয়ার ও ভের্লেনেরই দেখানো রাস্তায়, মনে করিয়ে দিলেন তা-ও। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ব্যক্তিগত পাঠে, অন্তত আমি, বোদলেয়ারের অন্তর্লীন প্রেরণা অনুবাদে তথা বঙ্গানুবাদেও মালার্মের কবিতাকৃতির তলায় লক্ষ্য করেছি; বিশেষত 'প্রতিদ্ধনি' গ্রন্থটিতে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত মালার্মের যে-ক'টি কবিতা অনুবাদ করেছিলেন, সেখানে। বুদ্ধদেব এক-ধাপ এগিয়ে আমাদের সরাসরি জানাচ্ছেন, 'অবস্থার শিরচ্ছেদ করো' কিংবা 'আত্মার একটি অবস্থার নামই কবিতা': ভের্লেন ও মালার্মে এমন পংক্তি কখনোই লিখতে পারতেন না, যদি না তাঁরা বোদলেয়ারের পরে জন্মাতেন। এখানেই ক্রমে স্পষ্ট হয়ে আসে, বুদ্ধদেব বসু'র এই বই কেবলই একটি অনুবাদগ্রন্থ নয়, ইতিহাসের এক অনিবার্য সন্ধিক্ষণকে ধরে রাখতে চাইছেন বুদ্ধদেব, শোধ করতে চাইছেন তাঁর দীর্ঘসময়ের ঋণ। যে যুগমুহূর্তে বিশ্বকবিতার ভাষা বিদ্যুচ্চমকে কেঁপে উঠেছিল। বুদ্ধদেব লিখছেন,
"'যা-কিছু কবিতা নয় তা থেকে কবিতার মুক্তির প্রথম দলিল 'ফ্লর দ্যু মাল', আধুনিক কবিতার জন্মক্ষণ ১৮৫৭।"
লা ফঁতেন অথবা আলেকজাণ্ডার পোপকে 'দ্রষ্টা' বলেই মানতে চাননি বুদ্ধদেব। লিখেছেন 'আত্মিক দৃষ্টি' নয়, 'রচনার নৈপুণ্যের বলে কবিখ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাঁরা'। ঐতিহাসিক অথবা 'সরকারি সমালোচকেরা' তাঁদের কবি বলে মানলেও, র্যাঁবো-এর মতো যাঁরা নিজেরা কবিতার বিষয়ে দ্রষ্টা, তাঁরা উপরোক্ত লেখকদের 'সমিল-গদ্যলেখক' বলেই জানবেন চিরকাল। তাহলে কি বুদ্ধদেবের এই অনুবাদকে আধুনিক কবিতার একটি প্রস্তাবনা হিসেবেও পাঠ করা যায়? রেনেসাঁ থেকে রোমান্টিকতা, বিশ্বকবিতার এই বিবর্তনকে বিচারের কূট আলোয় লক্ষ্য করলেন বুদ্ধদেব। তাঁর মতটি খুবই স্পষ্ট, রোমান্টিকতা যুক্তিসর্বস্বতার 'গুমোট' ভেঙে উঠতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত নিরালম্বই থেকে যায়।
"কল্পনার স্বাধীনতালাভ সত্ত্বেও, কবিতা ঠিক স্বপ্রতিষ্ঠ হতে পারলে না, তার দেহে লগ্ন রইলো আঠারো শতকের অনেক উচ্ছিষ্ট: জ্ঞানের ভার, উপদেশের ভার, হিতৈষণার জঞ্জাল।"
তাঁর মনে হয়েছিল, রোমান্টিক কবিতা উপদেশ ও বক্তব্যধর্মিতা থেকে সম্পূর্ণরূপে সরে আসতে পারেনি।বদল কেবল এসেছিল উপদেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে। 'সামাজিক আলাপ' থেকে কবিতা হয়ে উঠেছিল 'স্বগতোক্তি'। এই প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের 'কবিতার কথা' পাঠকের স্মরণে আসবেই। কিন্তু সবিনয়ে অনুরোধ করবো, কেবলই বুদ্ধদেবের চিন্তারেখা অনুসরণ করে সিন্ধান্তের দিকে অগ্রসর হতে। আলেকজান্ডার পোপ্ এবং শেলির মধ্যের তফাৎটুকুই কবি এবং অ-কবির মধ্যে তফাৎ, এমন কথাও বললেন বুদ্ধদেব। রোমান্টিক কবিদের দৃষ্টিক্ষমতা যে-কিছু কম ছিল, সেই ধারণাও কিন্তু খারিজ করেছেন সরাসরি। তাঁর মতে, রোমান্টিক কবিদের গোড়াতেই ছিল এক অনস্বীকার্য ভুল, 'অদৃশ্যকে' দেখতে এবং 'অশ্রুতকে' শুনতে চাইলেও কবিকে তাঁরা ভেবে বসেছিলেন 'জগতের হিতসাধক' কিংবা 'অস্বীকৃত বিধানকর্তা'। ওয়র্ডসওয়ার্থ-কৃত কবিতার প্রবাদপ্রতিম সংজ্ঞায়নও এই ক্ষেত্রে ক্ষতিসাধনই করেছে, কবিতাকে 'আবেগের প্রবহণমাত্র' ভেবে ভুল করে বসলেন তাঁরা। ফলত, বুদ্ধদেবের কাছে সহজেই ধরা পড়েছিল 'রোমান্টিক' কবিদের দৃষ্টির আবিলতা। রোমান্টিকতার যুগপুরুষদের সম্পর্কে সেই অমোঘ মন্তব্য তাঁর,
"কবিতা নয় এমন অনেক পদার্থের চাপে তাঁদের দৃষ্টিকণিকা শুদ্ধভাবে প্রতিভাত হতে পারেনি।"
সুতরাং, র্যাঁবো-এর কথাতেই ভরসা রাখতে বাধ্য হলেন।কবির কাজ যে সমাজরক্ষকের নয়, বক্তার নয়, প্রবক্তার নয়; যা-কিছু নিহিত গোপন অনাবিষ্কৃত, সেই 'সম্বন্ধসমূহের' আবিষ্কার-কাজে নিয়ত সচেষ্ট থাকতে হয় কবিকে, তাঁর যে অন্য কোনও দায়বদ্ধতা নেই, কেবল নিজেরই দৃষ্টির স্বকীয়তা অনন্যতা পরমতার প্রতি ছাড়া, এই কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিতে সঙ্কোচ করেননি বুদ্ধদেব। এবং এই বোধ থেকেই হয়তো সিদ্ধান্ত নিলেন বোদলেয়ার অনুবাদের, কেবলই বোদলেয়ার-প্রীতি- যেমনটা বাঙালি পাঠক ভেবে থাকে- হয়তো নয়, হয়তো আরও কিছু, হয়তো যুগমুহূর্তের এমন এক দ্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য এই অনুবাদকর্ম, যে-দ্রষ্টা সমাজ-সংস্থানের প্রত্যাশাপ্রস্তর সরিয়ে কেবলই নিজের নির্জ্ঞানের কাছে সমর্পণের স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন।
বুদ্ধদেবের সতর্কীকরণও আমাদের এ' প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার। তিনি মনে করিয়ে দেন, রোমান্টিকতার নিন্দা করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়, বরং রোমান্টিকতাই সেই 'মৌলিক, স্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য চিত্ত-বৃত্তি' যা 'ব্যক্তিমানুষকে মুক্তি দান করে'। কীভাবে, তা-ও স্পষ্ট করেছেন লেখক। এবং এই প্রসঙ্গ একাধিকবার উত্থাপিত হয়েছে তাঁর লেখালেখি তথা প্রবন্ধকর্মে। 'আধুনিক কবিতায় প্রকৃতি' প্রবন্ধে যেমন প্রকৃতির কাছে রোমান্টিক কবিদের আশ্রয়প্রার্থনা বিশদে আলোচনা করেন। ভূদৃশ্য ও প্রকৃতির প্রতি এই মুগ্ধতা এক ধরনের ব্যক্তিমাত্রিক মুক্তি তো দিয়েছিলই তাঁদের, যদিও সেই মুক্তি প্রশ্ন ও সন্দেহের অতীত নয়। কিন্তু এখানে উল্লেখ্য যা, তা সত্ত্বেও বুদ্ধদেব শেষ অবধি সজাগ থাকতে চেয়েছেন রোমান্টিকতার অবভাস সম্পর্কে। রোমান্টিকতা, বুদ্ধদেবের মতে, 'নেহাৎ সাহিত্য' থেকে 'কবিতার' পার্থক্য স্পষ্ট হতে দেয়নি, ফলত রোমান্টিক কবিতা শেষপর্যন্ত গণ্য হয় স্রেফ 'কবিত্বমণ্ডিত রচনা' হিসেবেই। অন্যদিকে শার্ল বোদলেয়ার কবিতায় এমন কিছু-কে স্থান দিলেন না যা কবিতা নয়, এখানেই বুদ্ধদেবের কাছে বোদলেয়ারের অবস্থান সর্বাগ্রগণ্য হয়ে ওঠে: বোদলেয়ার, বোদলেয়ারই প্রথম, হয়ে ওঠেন বিশুদ্ধ কবিতার রচয়িতা। কেবল তা-ই নয়, বোদলেয়ারের ভূমিকা ও কাজ রোমান্টিতার 'পরিশোধন' ও 'পরিশীলন'-এও প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। বুদ্ধদেবের চিন্তাপরিসরের অন্যতম ভিত যেটি, বিশুদ্ধ সাহিত্য- যা চৈতন্যের রক্ত ও মেদ মেখে জেগে ওঠে অতল থেকে- তেমনই এক চিন্তাবিন্দু থেকে হয়তো এই অনুবাদযাত্রার সূত্রপাত।
বোদলেয়ারের কবিতাকৃতি বুদ্ধদেবের কাছে একটি সমবিন্দুর মতো ধরা দিল। দেখালেন, আধুনিকতার যে পূর্বাভাস লক্ষিত হয়েছে ইংলণ্ডে ব্লেক কীটস কোলরিজ, জার্মানিতে নোভালিস হ্যেল্ডার্লিন, ফ্রান্সে নের্ভাল ও গোতিয়ে, আমেরিকায় পো এবং হুইটম্যানের কবিতায়, বোদলেয়ার যেন সেই লক্ষণ ও সূত্রগুলিকে গ্রথিত করে ভবিষ্যতের জন্যে তৈরি করেছেন একটি অখণ্ড শিল্পমালা। এডগার আলান পো'র প্রতি বোদলেয়ারের মুগ্ধতার কথা উল্লেখ করলেন বুদ্ধদেব। লিখেছেন,
"পো-র মধ্যে তিনি দেখেছিলেন 'সেই আধুনিক কবিকে, যিনি সর্বমানবের হয়ে দুঃখ পান'; অর্থাৎ, পো-র মধ্যে নিজেকেই দেখেছিলেন।"
বস্তুত, বিশুদ্ধ কবিতার উপাসক বুদ্ধদেবও কি বোদলেয়ারের মধ্যে তির তির করে কাঁপতে থাকা নিজেরই একটি ক্ষীণ ছায়া দেখেননি?
সমবিন্দু কেবলই নানান লক্ষণ ও পূর্বাভাসের প্রতিচ্ছেদেই নয়, দুই চূড়ান্ত মেরুর বিষমতা শোষণ করে বোদলেয়ার তাঁর শিল্পে যে এক আশ্চর্য সুষমতা তৈরি করলেন, মিলিয়ে দিলেন দুই বিপরীতকে, তা-ও স্বাভাবিকভাবেই বুদ্ধদেব-কে অভিভূত করে। দেখতে পান, ক্লাসিক ও রোমান্টিকের চিরায়ত দ্বন্দ্ব দ্বৈততা ও পরস্পরবিরোধিতার মধ্যেই এক সুষম মিথস্ক্রিয়া, সংশ্লেষ। লিখলেন,
"প্রথম কবি তিনি, যাঁকে পড়ে আমরা অনুভব করি যে ক্লাসিক ও রোমান্টিকের ধারণা দুটি অমোঘভাবে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরস্পরের জন্য তৃষিত, এবং একই রচনার মধ্যে দুই ধারার সংশ্লেষ ঘটলে তবেই কবিতার তীব্রতম মুহূর্তটিকে পাওয়া যায়।"
ফলত, এই প্রতর্কের প্রাসঙ্গিকতা থেকেই যায়, বুদ্ধদেবের বোদলেয়ার-অনুবাদ আদতে আধুনিক কবিতা ও কবিতার বিবর্তনীয় বিশ্ববীক্ষার প্রতি এক আধুনিক কবির আন্তরিক ঋণ-পরিশোধ।
Comments