অনুবাদ কবিতা - জয়া চৌধুরী








নিকারাগুয়ার গত বিংশ শতকের সবচেয়ে বর্ণময় কবি এর্নেস্তো কার্দেনালের জন্ম শতবর্ষ চলছে ২০২৫ সাল জুড়ে। জন্ম একশ বছর আগে সে দেশের মানাগুয়া শহরে। কবি কার্দেনাল তাঁর কবিতার মাধ্যমে লাতিন দেশগুলিতে অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পক্ষে মানুষের মধ্যে জাগরণ ঘটান। তাঁর জনতার কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। সান্দিনিস্তা আন্দোলনের তাত্ত্বিক নেতাদের অন্যতম এর্নেস্তো ছিলেন গির্জার পাদ্রী। কিন্তু এর বাইরেও সারাজীবন তিনি নিপীড়িতের স্বার্থ আদায় ও রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। চিত্রশিল্পী হিসাবে তিনি সোলেনতিনামে দ্বীপে গড়ে তোলেন প্রিমিতিভিস্তা অর্থাৎ শিল্পে আদিমবাদ আন্দোলন। এমনকী সান্দিনিস্তা সরকারে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রী হিসাবেও ১৯৮৯ – ১৯৯৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যদিও পোপ দ্বিতীয় জন পল তাঁকে পৌরোহিত্যের কাজের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু পোপ ফ্রান্সিসকো তাঁকে যাজক হিসাবে অধিকার ফিরিয়ে দেন ২০১৯ সালে। ২০২০ সালে ৯৫ বছর বয়সে প্রয়াত হন লাতিন আমেরিকার এই বহুল চর্চিত কবি।



(১)
খালি বিয়ারের বোতল


আমার দিনগুলো ছিল খালি বিয়ারের
বোতল আর, নেভানো সিগারেটের বাটের মতন।
টিভির পর্দায় যেভাবে শরীরের সিল্যুয়েট সরে সরে
যায় এবং অদৃশ্য হয়ে যায়, আমার জীবনটা তেমনই কেটেছে।
রেডিওয় বাজতে থাকা গান ও মেয়েদের হাসির সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে
হাইওয়ে দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যায় গাড়িরা…
আর সৌন্দর্যও দ্রুত অতিক্রান্ত হয়ে যায় ঠিক যেভাবে গাড়ির মডেল
আর রেডিওর গানগুলোর ফ্যাশন পুরনো হয়ে যায়
সেসব দিনের মত কিছুই তো আর বাকি থাকেনি, শুধু সিগারেটের নেভানো বাট
আর খালি বিয়ারের বোতলগুলো, ছেঁড়া টিকিট,
আর নষ্ট হয়ে যাওয়া ফটোর হাসিগুলো,
এবং করাত ছাড়া যা দিয়ে ওরা ভোরবেলায় পানশালাগুলি ঝাঁট দিয়েছিল।



(২)
মেরিলিন মনরোর জন্য প্রার্থনা


প্রভু
এই মেয়েটিকে গ্রহণ করো তুমি সারা পৃথিবী যাকে
মেরিলিন মনরো নামে চেনে
যদিও সেটা তার সত্যিকারের নামও নয়
(কিন্তু তুমি তো জানো তার আসল নাম, ওই সে অনাথ মেয়ে যে ন’ বছর
বয়সে ধর্ষিত হয়েছিল
আর দোকানের ষোল বছরের কর্মচারিনী যে নিজেকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল)
এবং এখন সে তোমার সামনে কোনরকম প্রসাধন
কোনো প্রেস সচিব
কোনো অটোগ্রাফ কিংবা ফটোগ্রাফ ছাড়াই নিজেকে উপস্থিত করেছে
মহাবিশ্বের রাতে একাকী মহাকাশযাত্রীর মত একলা।

যখন সে ছোট ছিল একবার সে গির্জায় নগ্ন হয়ে রয়েছিল একটা স্বপ্ন দেখেছিল
(টাইম পত্রিকায় যেভাবে বলা হয়েছে)
মাথা মাটিতে ঠেকানো উপুড় হয়ে থাকা জনতার সামনে
তাকে বুড়ো আঙুলের ডগায় ভর দিয়ে পা টিপে টিপে হাঁটতে হয়েছে যাতে মাড়িয়ে না দেয়।
মনস্তত্ববিদদের চেয়ে বেশি তুমিই জানো আমাদের স্বপ্নের কথা,
গির্জা, বাড়ি, গুহা, মায়ের গর্ভের মত নিরাপদ
কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছুও বটে …
মাথারা হল প্রশংসক, এটা পরিষ্কার
(আলোর স্রোতের নিচে মাথাদের জটলা)।
তবে মন্দির কিন্তু টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স-এর স্টুডিও নয়।
সোনা ও মর্মের মন্দির – হল ওর শরীরের মন্দির
মানবপুত্র যেখানে চাবুক হাতে রয়েছেন দাঁড়িয়ে
টোয়েন্টিএথ সেঞ্চুরি ফক্সের দোকানদারদের তাড়াতে তাড়াতে
যারা তোমার প্রার্থনাগৃহকে করে তুলেছে চোরেদের গুহা।

প্রভু, পাপ ও তেজস্ক্রিয়তায় দূষিত এই পৃথিবীতে
এত একলা দোকানের ওই কর্মচারিনীটির
দোষ তুমি ধরবে না।
যে সমস্ত দোকানের কর্মচারিনীদের মত
চলচ্চিত্র তারকা হবার স্বপ্ন দেখেছিল

এবং ওর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল
(তবে তা টেকনিকালারের মত বাস্তব),
ও শুধু সে চরিত্রই রূপায়িত করেছিল
আমরা ওর হাতে যা তুলে দিয়েছি
-আমাদের নিজেদের জীবনের চিত্রনাট্য
ওসব- আর সেটা অবাস্তব এক চিত্রনাট্য ছিল ।
মেয়েটাকে ক্ষমা করো প্রভু, সেইসঙ্গে
টুয়েন্টিএথ সেঞ্চুরি ফক্সের জন্য আমাদেরও ক্ষমা করো
এই বিপুল সুপার প্রোডাকশন যাতে আমরা সকলে কাজ করেছি।
ওর বড্ড ভালবাসার খিদে ছিল আর
আমরা ওকে ঘুমের বড়ি দিয়েছি।
সাধু না হতে পারার দুঃখে
ওকে মনো বিশ্লেষকের কাছে যেতে বলেছি।
মনে আছে প্রভু, ক্যামেরার সামনে ওর বাড়তে থাকা ভয়
আর প্রসাধন করাতে ঘেন্না – প্রতি দৃশ্যের আগে
প্রসাধন করতে জোরাজুরি করতে করতে –

কিভাবে যেন সে ভয় প্রকট হয়ে যাচ্ছিল
আর স্টুডিওতে পৌঁছনোর সময়কাল হচ্ছিল দেরী।

দোকানের সমস্ত কর্মচারিনীদের মত
চলচ্চিত্র তারকা হবার স্বপ্ন দেখেছিল
আর ওর জীবন হয়ে গিয়েছিল অবাস্তব যা
একজন মনস্তত্ববিদই বুঝতে আর জেনে রাখতে পারত

তার রোম্যান্সগুলি ছিল বোজা চোখের পাতায় রাখা চুমুর মত
যাতে যখন ওগুলো খুলবে
আবিষ্কার করবে সামনে শুধু রিফ্লেক্টরের আলো
এবং রিফ্লেক্টরের বাতিগুলি বুজে গেছে!
আর বসবার ঘরের দেয়াল বেয়ে ওরা নেমে এসেছিল
(ওটা সিনেমাটোগ্রাফির সেট ছিল)
ততক্ষণে নির্দেশক সরে গিয়েছেন হাতে নোটবই নিয়ে
কেননা দৃশ্যটি অধিগ্রহণ করা হয়ে গিয়েছে
অথবা ইয়টে চড়ে কোনো ভ্রমণের মত,
সিঙ্গাপুরে একটি চুমু, রিওয় একটু নাচতে নাচতে
উইন্ডসরের ডাচ ও ডাচেসের আমন্ত্রণ
বিচ্ছিরি অ্যাপার্টমেন্টের বসবার ঘরের দৃশ্য।
শেষ চুমু খাবার আগেই ছবিটি শেষ হয়ে গিয়েছে।
ওরা ওকে খুঁজে পেয়েছিল টেলিফোনে হাত রেখে মৃত অবস্থায়
আর গোয়েন্দারা জানত না কাকে ফোন করতে হবে
যেন কেউ ডায়াল করেছিল একমাত্র বন্ধু কন্ঠকে
এবং কেবল শুনেছিল রেকর্ড বেজে যাচ্ছে- রং নাম্বার।
যেন কেউ গ্যাংস্টারদের হাতে আহত হয়েছে
একটা বিচ্ছিন্ন টেলিফোনের দিকে হাত বাড়িয়ে।

প্রভু, মেয়েটা কে যাকে ও ফোন করতে যাচ্ছিল
এবং করেনি (হয়ত কেউ ছিল না
কিংবা এমন কেউ যার নাম লস এঞ্জেলসের টেলিফোন ডিরেক্টরিতে ছিল না)
ওর ফোনের তুমি উত্তর দাও, প্রভু!



(৩)
এখানে পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল …


এখানে এইসব রাস্তা দিয়ে
পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল সে
কর্মহীন পদহীন

এবং কোন ভার ছাড়া

কেবল কবিরা, বেশ্যারা
কিন্তু

তোমরা ওকে মনে করো যখন
তোমাদের কংক্রিটের সেতু থাকবে,

বিশাল ঘূর্ণিযন্ত্র,
ট্র্যাক্টরেরা, রুপোলী শস্যাগার,

ভালো সরকারেরা।
জাতীয় নিরাপত্তাবাহিনী
একজন লোক
খুঁজে বেড়াচ্ছে

সে মানুষ অপেক্ষা করছে
সীমান্তে
কখন রাত নেমে আসবে

সে মানুষটার
নাম
জানা নেই

ওখানে বহু মানুষ
রয়েছে
খাদের তলায়
সমাধিমগ্ন

সংখ্যা এবং
ওইসব মানুষদের
নাম জানা নেই কারো।

জানা নেই জায়গাটিও
জানা নেই খাদের সংখ্যাও।

জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী
সে লোকটিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে

লোকটা অপেক্ষা করছে
আজ রাতে কখন বের হয়ে যাবে
নিকারাগুয়া থেকে




(৪)
আমি অন্য দেশ ভালবাসি


আমাদের এখানে একটা দেশ গড়তে হবে
আমরা শপথভূমির দ্বারপ্রান্তে রয়েছি
যেখান থেকে নারীর মত দুধ ও মধু নির্গত হয়।

এই দেশ থেকে আমার গান হয়, কবিতা হয়
কিন্তু তবুও বরাদ্দ থাকে
আর যখন নিউইয়র্কের পকেটে ঘন্টা শোনা যায়
এমন কিছু যেটা তোমার জানা নেই, ভাই, ওরা
তোমাকে সরিয়ে ফেলেছে।

বিপ্লবী সান্দিনো কৃষকদের বলেন
“একদিন আমরা জয়লাভ করব” এবং,
আমি যদি তা না দেখি, পিঁপড়েরা
মাটির তলায় একথা বলতে আসবে
আমাদের।
জিনিষেরা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি মানুষ।
এখানে এত যে গম আছে কর্ষণ করবার।
শেখাবার জন্য এত যে শিশু রয়েছে,
চিকিৎসায় সারিয়ে তুলবার জন্য রয়েছে এত রোগী,
ভালবাসবার জন্য রয়েছে এত যে প্রেম,
এত গান…

Comments

আরও পড়ুন

গল্প - জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

বীথিকা ধরে হেঁটেছে দীন

সৌমিত ভট্টাচার্য্য