অনুবাদ কবিতা - শ্রাবণী গুপ্ত

 




১৯৭০-এর দশক থেকেই গ্র্যান্ট ক্যাডওয়েল-এর কবিতা নিজের দেশ অষ্ট্রেলিয়া ছাড়াও কানাডা, কলম্বিয়া, জার্মানি, ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইটালি, জাপান, নিউজিল্যান্ড এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলিতেও প্রকাশিত হয়েছে। অনুদিত হয়েছে আরবি, চাইনিজ, জার্মান, জাপানিজ, বাংলা এবং স্প্যানিশ ভাষায়। দ্য এজ বুক অফ দ্যা ইয়ার অ্যাওয়ার্ড এবং অষ্ট্রেলিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন অ্যাওয়ার্ডের জন্যেও মনোনিত হয়েছে ওঁর বই। Reflections of a Temporary Self—ওর অষ্টম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। প্রায় তিন দশক ধরে লিখে চলেছেন ক্যাডওয়েল। নির্ভিক স্বর এবং বিষয়বস্তুর অভিনবত্ব স্বতন্ত্র করেছে অষ্ট্রেলিয়ার কাব্য জগতে। ফর্ম নিয়ে যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা নির্মিতি আপাত জটিল মনে হলেও দেখা যায় ওঁর কবিতা পাঠকের সাথে সরাসরি কথা বলে। অথচ কবিতার ভেতরে পাঠক স্থির বসতে পারবেন না, এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াবে, বারবার ফিরে আসতে হবে একই কবিতার কাছে। তারপর একসময় পাঠক অভিভূত হবেনই, কেননা আপাত সরল কবিতার ভেতরেও কিন্তু লুকিয়ে থাকে আত্মিক কথোপকথন। এই যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া কবিতা, এখানেই ক্যাডওয়েল স্বতন্ত্র কাব্যভাষা অহেতুক অলংকার দাবি করে না। আপাত নিরীহ শব্দের ভেতরই লুকিয়ে থাকে বিস্ফোরক দর্শন যা পাঠককে হতচকিত করে, অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখে চুপচাপ। কবিতা ছাড়াও ওঁর গদ্য প্রকাশিত হয়ে আসছে। পেয়েছেন একাধিক পুরষ্কার। অষ্ট্রেলিয়ার কবিতাকে দেশ বিদেশের নানান মঞ্চে উপস্থাপন করেছেন, এসেছেন ভারতেও। যাপনচিত্র কবিতা উৎসব-এ কবিতা অনেককেই মুগ্ধ করেছে।




(এক)
আমি তো আসলে কৌশল নই ফুলেরই

ভেবেছিলে আমি কৌশল বুঝি ফুলেরই
একেবারে নয়
আমি তো আসলে ফুল-ই

আমাকে তোমরা যা-ই ভাবো তাতে ক্ষতি নেই
খুব বয়ে গেছে ভাবতে— তোমরা ভাবো কী

আমি আলস্য একাধারে আমি উদ্যম
নিজেকে রেখেছি সেটুকু বলার দাবিদার
নই কৌশলী ফুলের সুরভি ছড়াবার

ধুলো খেয়ে বাঁচি সূর্যকে খাই উন্মাদ
বৃষ্টির জল পান করি জেনো সংবাদ
আমার পরিধি আমাকে ছাড়িয়ে ছারখার
তোমরা কী ভাবো জানা বুঝি খুব দরকার

ধারণ করেছ তোমরা যতটা, আমি নই
আমাকে বুঝতে আরও তীক্ষ্ণতা দরকার
জেনে রেখো আর মনে রেখো আমি ফুল-ই
নই কৌশলী ফুলের সুরভি ছড়াবার

ফুল হতে আমি মরিয়া তো নই কখনই
খুব বয়ে গেছে ভাবতে তোমরা ভাবো কী
বলে যাই তবু বলে যাই আজ বারবার
আসলে আমি তো সুরভিত এক ফুল-ই

আমিই পৃথ্বী আমিই সূর্য, বারিষও
কৌশলে হতে চাই না কখনো কোনো ফুল

তোমরা কী ভাবো
বয়ে গেছে সেই ভাবনার
জেনে তো গিয়েছি কোনটা আসলে নির্ভুল।


(দুই)
সেই বাগানের একটি প্রশ্ন


তুমি কি দেখেছিলে
বাগানে ওখানে কে
সেই তো তখনই তো
ওই যে ওই ঋজু রডোডেনড্রনের আড়ালে
কিন্তু ওই দেখো লিলাক ও আইরিশ—
আহা কী সুন্দর
তুমি কি কখনও কি
দেখেছ ওই মিহি জামা কী সুন্দর
ওই যে নীল সাদা পরতে পরতে
ওই যে ঝুলে থাকা ওই যে গড়ন আর তার সে গাঢ় চুল
কোথায় পেয়েছে সে এমনতর চুল
ওখানে কী যেন কী ছায়াতে মায়াতে
তুমি কি শুনেছ কি
সেসব চলাফেরা অথবা হাহাকার ঘোষণা ছাপিয়ে
অথবা দেখেছ কে ছায়াতে আলোতে
আহা
ও- লনটির সীমানা পেরিয়ে যেখানে ঝোঁপ আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
সমস্ত কিছু আজ জানি না কেন যে
এতটা পরিষ্কার
এমনকি সূর্যিমামাও বেরিয়ে এসেছে।


(তিন)
ব্রেকের দর্শন

আগামীর ভয়ানকবার্তা নিয়ে
ঘড়ির মতন যেন কিছু একটা এগিয়ে আসছে

যেন ট্রেন —চালকবিহীন
যেন ট্রেন —নিয়ন্ত্রণহীন

আমরা এটাই ধরে রাখি: চালকের দর্শন

এসব ভাবতে ভাবতে
তোমার চোখে ঘুম আসে না
এসব ভাবতে ভাবতেই
তুমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলো তোমার আত্মসমর্পণ থেকে

তুমি দেখছ—
তোমার একটাও স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না

তুমি দেখছ—
তোমার দেহই তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে
অবলা এক শিশুর মতন
এভাবে চলবে না
হয় তুমি এসব অবজ্ঞা করো
নয়তো এমন কিছু একটা করো যাতে এসব বন্ধ হয়
এবং বৃত্তটি সামান্য কিছুটা এগিয়ে আসে।


(চার)
রূপান্তরিতের কাছে প্রচার


তোমার একটা অংশ
আরেকটা অংশের সঙ্গে কথা বলছে

ফাঁকে প্রাচীন কালশিটে

যে পাখিটি খাঁচায় নেই
সে এর নাম জানে না
আর
যে পাখিটি খাঁচায় সে
কেবলই বলে চলে আর বলে চলে

এই সুস্বাদু ভয় এবং ঘৃণা
এগুলো আসলে কী
যা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখে
তোমার ইতিহাস
প্রত্যেকদিনই আসে
মুঠো ভর্তি অন্য মাটি নিয়ে।



(পাঁচ)
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে

১.

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে
একজনকে দেখলাম —
আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে

আমি উপরের দিকে তাকিয়েও কিছু দেখতে পেলাম না

তাই অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম:
তুমি এভাবে কিসের দিকে তাকিয়ে আছ বন্ধু!

সে আমার দিকে তাকিয়ে শুধু বলে উঠল:
আকাশ।


২.

রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে
দেখলাম —
একজন উপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে,
একটা গাছের দিকে

আমিও তাই কৌতুহলবশত গাছটির দিকে তাকালাম
কিন্তু
কিছুই দেখতে পেলাম না

বিস্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম:
তুমি এভাবে কিসের দিকে তাকিয়ে আছ বন্ধু!

সে তাকাল, আমার দিকে এবং বলল:
ওই পাজি শয়তান ম্যাগপি
ওই ও-ই তো এই, এই দেখো আমার মাথায়
কেমন আঁচড় দিয়েছে

আমি তাই দ্বিতীয়বার গাছটির দিকে তাকালাম
তাকাতেই সেই ম্যাগপিকে দে
খতে পেলাম
এবং আমি তাকাতেই এক পলকেই ও উড়ে গেল

ওই, ওই তো ও—আমি বলে উঠলাম
কোথায়! কোথায়!

জিজ্ঞেস করতে করতে—
লোকটি দেখলাম ভুল দিকে তাকিয়ে রয়েছে।




Comments

আরও পড়ুন

গল্প - জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

বীথিকা ধরে হেঁটেছে দীন

সৌমিত ভট্টাচার্য্য