কবিতা অনুবাদের বিষয় আশয় | শুভদীপ মৈত্র




কাব্য প্রাচীনকাল থেকে মুখে মুখে ফিরে অনুবাদসাধ্য হয়েছিল তার নিজের তাগিদেই। তার জন্মের প্রদোষকালে সে ছিল ভাব ও কাহিনির বাহন, তাই সাধারণের মুখে মুখে এক উপভাষা থেকে থেকে আরেক উপভাষায়, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় তার ছিল স্বছন্দ গতি, তার কোনো দায় ছিল না কোনো মূলনিষ্ঠ হওয়ার, ‘আসল’ এর রূপ বজায় রাখার, সে নিজের খেয়ালে গ্রহন, বর্জন ইত্যাদির মাধ্যমে নতুন নতুন জীবন লাভ করত। সহজ উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, রাধা-কৃষ্ণের গল্প, বৃন্দাবন লীলার কথা সবাই জানে কিন্তু জয়দেব আর বিদ্যাপতিতে, কী বিদ্যাপতি ও চন্ডিদাসে তার ভেদ প্রচুর, কৃত্তিবাসের নবদূর্বাদলশ্যাম রাম আর বাল্মিকির রাম স্বাভাবিকভাবেই আলাদা। আধুনিক অনুবাদের মানদণ্ডে তাদের ধরা যাবে না। কবিতা যখন ছাপা বইয়ে ঘর বাঁধল, এবং আধুনিক মানুষের শিল্প চর্চার সঙ্গী হল তখন অনুবাদ এক নতুন দিগন্ত খুলল, যা সহজ আটপৌরে আদানপ্রদান হয়ত নয়, আগে যেমন ছিল, তবু রসের বিনিময়ে তার দান কম হল না। বাংলা ভাষা যখন উনিশ শতক জুড়ে ঔপনিবেশিক সময়ে তার আধুনিক চেহারা পাচ্ছিল একটু একটু করে, তখন সংস্কৃত, ইংরেজি, ফার্সী ইত্যাদি নানা ভাষার সাহিত্য অনুবাদ তাকে জুটিয়েছিল স্বরূপ উন্মোচনের সাহস, তার ভাষাকে দিয়েছিল নতুন পথে হাঁটার দিক নিদের্শ। নতুন নতুন ভাবনার খোড়াকও যে জোটায়নি তা নয়, কিন্তু মূলত ছিল তার প্রয়োজনের দিক, কাঠামো তৈরির ইন্তেজাম।

ঈশ্বর গুপ্ত, নবীনচন্দ্র, মাইকেল পেরিয়ে যখন আধুনিক বাংলা সাবালক হল, রবীন্দ্রনাথের মতো যুগন্ধর প্রতিভাকে পেল, তারপর এল অনুবাদের আধুনিক দিক। ভাষা শক্তপোক্ত হয়েছে বলে অনুবাদ বন্ধ হবে তা নয়। নিজের বাড়িতে কালিয়া পোলাও রাঁধা হয় বলেই যে প্রতিবেশীর কোনো হেঁসেল থেকে অচেনা মশলার খোশবাই এলে কৌতু্হল হবে না? আর তা দিয়ে নতুন কোনো পাক প্রাণালী বাড়িতে আমদানি করা যাবে না এমনও নয়, কাজেই অনুবাদ আধুনিক সাহিত্যে তথা কবিতায় এল নতুন চাহিদা নিয়ে।

গত শতকের তিরিশের দশকের তরুণ কবিদের দল বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে-রা নিয়ে এলেন বিশ্বের কবিতাকে বাংলা কবিতার উঠোনে। বৈশ্বিক কবিতা শুধু নয় সেই কবিতার ভাবনা, তত্ত্ব হয়ে উঠল চর্চার বিষয়। এই যোগাযোগ এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল বাংলা কবিতার। কবিতার অনুবাদ শুধুমাত্র অনুবাদ থাকল না, হয়ে উঠল নতুন পথের সন্ধান। বিষ্ণু দে টিএস এলিয়ট অনুবাদ করলেন আধুনিক গদ্য কবিতার ভাবনা ও শৈলী এই দুইকেই বাংলা কবিতায় নিয়ে আসতে। আধুনিকতা নিয়ে যেমন তেমনি ছন্দের মুক্তির জন্যও এলিয়ট চর্চা শুরু হল। সুধীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করে তরুণ বিষ্ণু দে একটি সভা পর্যন্ত বসিয়ে দিলেন, যেখানে সুধীন্দ্র এলিয়ট ও আধুনিক কবিতা নিয়ে বক্তৃতা দিলেন। যা পরবর্তীকালে প্রবন্ধাকারেও বেরয় ও বিখ্যাতও হয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও অনুবাদ করলেন এলিয়টের কবিতা। এবং নিজেও গদ্য কবিতার দিকে ঝুঁকলেন। শুধু বিষ্ণু দে বা রবীন্দ্রনাথ নন, আবু সৈয়দ আয়ুব ও আরো অনেক সে-সময়েরর তরুণ কবিরা মাতলেন এলিয়ট অনুবাদে। এভাবে কবিতার শৈলীর নতুন একটা দিক খুলল, যাকে অবশ্যই অনুবাদেরই দান বলা যায় বাংলা সাহিত্যে।

শুধু এলিয়ট নয়, ইয়োরোপের তাবড় তাবড় কবিদের অনুবাদ শুরু করলেন সেকালের কবিরা। তার একটা বড় কারণ রবীন্দ্র-প্রভাব মুক্তির দুরূহ চেষ্টা। অতবড় এক মহিরূহ যদি সাক্ষাৎ পূর্ববর্তী হন, তাহলে বেচারা অনুজদের বেড়ে ওঠা ও ঐকিক কবিতা প্রচেষ্টা সেই ছায়ায় দুর্বল হতে বাধ্য, এ-কথা বুঝে তিরিশের সেই তরুণ তুর্কিরা হাত পাতলেন ইয়োরোপের দিকে। বুদ্ধদেব বসু ব্যোদল্যের-এ ডুব দিয়ে তুলে আনলেন কবিতার নতুন ভাষ্য, সুধীন্দ্রনাথ মালার্ম-এ স্থিত হলেন, বিষ্ণু দে-র এলিয়ট অভিযানের কথা আগেই লিখেছি। প্রত্যেকেরই কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে এক প্রাতিস্বিক বোধ গড়ে উঠেছিল, এবং প্রত্যেকেরই অনুবাদের ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য দেখা যায়, যেমন বুদ্ধদেব বসু ব্যোদল্যের অনুবাদ করলেন। কিন্তু ব্যোদল্যের-এর বিখ্যাত গদ্য কবিতা ‘পেতিত পোয়েত্রি আঁ প্রোজ’এর থেকেও ছন্দের কবিতার দিকে টান ছিল তাঁর বেশি। বুদ্ধদেব যতটা না ইয়োরোপীয় আধুনিক কবিতার বিষয় ও ভাবের উপর জোর দিয়েছেন ততটা জোর তাঁর শৈলীর দিকে দেখা যায়নি, অন্তত তাঁর যৌবনে । আবার সুধীন্দ্রনাথের অনুবাদ অন্য রকম। তা নিখাদ সুধীন দত্তীয়, তিনি নিজে যে কাব্য-ভাষায় পৌঁছেছিলেন, যা আজও বিস্মিত করে আমাদের, অনুবাদের ক্ষেত্রেও তিনি সেই ভাষাই ব্যবহার করলেন। তাঁর মালার্ম-এর ফন-এর স্বপ্ন আর শেক্সপিয়রের সনেটে ভাষাগত খুব দূরত্ব নেই। ফলে আধুনিক কবিতার ভাষা হিসেবে সাধু থেকে চলিতে যাতায়াত শুরু করলেও, ছন্দ ইত্যাদির জায়গায় মুক্তি ঘটল না অন্তত আরো তিন দশক।

বিষ্ণু দে-র এলিয়ট অনুবাদ সেদিক দিয়ে শৈলী, ভাষা ও ভাবনার মেলবন্ধনে আরো বেশি পরিধি জুড়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে কাজ করে। কবি বা অনুবাদক যখন কবিতা অনুবাদ করছেন তার উদ্দেশ্য কবিতার রসটি চালান করা নিজ ভাষার পাঠকদের কাছে হতে পারে, হতে পারে কোনো বিখ্যাত বিদেশী কবিকে পরিচয় করানো, অথবা কবিতার ভাবনা ও কাঠামোকে নতুনতর কিছু দেওয়ার জন্যও হতে পারে। এই তিনের উদাহরণই কমবেশি বাংলা কবিতায় পাওয়া যায়, তবে বিষ্ণু দের মধ্যে এই তিনের উপস্থিতি তাঁর সারা জীবনের অনুবাদের কাজকে অন্য মাত্রা দেয়।

গোয়েথে থেকে ইয়েটস হোক বা র‍্যাঁবো থেকে রিলকে অনুবাদ হয়েছে সেই কবিদের আশ্চর্য্য প্রতিভার ছটা যখন এসে পৌঁছেছে এদেশে, তার মুগ্ধতা থেকে। আবার অন্যদিকে দেখা গেছে সমসময়ের সামাজিক দায় থেকে অনুবাদের দিকে গেছেন অনেকে। যেমন বাম প্রগতিশীল কবিরা স্বাধীনতাত্তোর বাংলায় রাজনৈতিক জায়গা থেকে ভেবেছেন অনুবাদের কথা। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন যেমন অনুবাদ হয়েছে তেমনি সোভিয়েত প্রগতি সাহিত্য অনুবাদও বাদ পড়েনি। বিষ্ণু দে যেমন পরবর্তী কালে সেই দিকে হেঁটেছেন, তেমনি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও নবারুণ ভট্টাচার্য্য সে ভাবনা থেকেই অনুবাদ করেছেন দেশ বিদেশের কবিতা। একে সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রণোদনা বা প্রপাগান্ডা ভাবলে ভুল হবে, কারণ ভাবনা ও ভাষাকে সম্পূর্ণ আলাদা করা যায় না, ভাষা ক্ষমতা কাঠামোর অংশ। নেরুদা-র কবিতা বা আর্নেস্তো কার্দেনালের কবিতা কেউ অনুবাদ করলে, তাঁদের রাজনীতিকে ধরতে হবে এই বড় জায়গাটা থেকে। আর রাজনীতিকে ধরতে কবিতার ভাষাগত রাজনীতিকেও ধরা প্রয়োজন। নেরুদার কবিতার শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের করা অনুবাদ পড়লে দুর্বলতা ধরা পড়ে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের চমকপ্রদ কাব্য-ভাষা সেখানেও রয়েছে, কিন্তু তাঁর ভাষা ঔপনিবেশিকতা বিরোধী, পুঁজিবাদ বিরোধী সর্বহারা শ্রেণীর স্বরের আনাগোনা ধরতে একেবারেই অক্ষম। প্রেমিক ও ব্যক্তি কবি নেরুদার যে ছাপ দেখতে পাই তাঁর রাজনৈতিক অটল অবস্থানের কণামাত্র দেখা যায় না, কারণ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নিজস্ব কবিতায় সে ছাপ ছিল না, এবং যে উৎকেন্দ্রিক ব্যক্তিবাদী জায়গা থেকে তিনি কবিতাকে দেখতেন তার মধ্যে যেটুকু নেরুদা রয়েছেন সেইটুকুই বড়জোর, অর্থাৎ ক্যাপ্টেন’স ভার্স-এর নেরুদাকে পাওয়া সম্ভব কান্তো হেনারেল-এর নেরুদাকে নয়।

আসলে কবিতা তৈরি হয় ভাষা দিয়ে, শিল্পের সে মূল আকরিককে অগ্রাহ্য করলে, তার প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি না রাখলে কোনো ফর্ম বা কন্টেন্ট-এর পরীক্ষা, নিরীক্ষা উৎরোয় না, অনুবাদের উদ্দেশ্য যদি সেই বৈশ্বিক মূল কবিতার থেকে অনুদিত ভাষায় তা আমদানি করা হয়, তাহলে সেদিকে নজর না দিয়ে উপায় নেই। উদ্দেশ্যটা বোঝা সেই জন্য খুব প্রয়োজন, নাহলে নিখাদ অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট হয়ে যায় অনুবাদ। ধরুন কেউ সুররিয়ালিস্ট বা দাদা পোয়েট্রি অনুবাদ করছে, বা কেউ বিট জেনারেশান-এর ডিরেক্ট পোয়ট্রি বা কেউ অটোমেটিক রাইটং অনুবাদ করছেন, বিভিন্ন এই শৈলীগুলো অনুবাদ শুধুমাত্র পাঠককে সেগুলো চেনানোর জন্য করছেন না, করছেন সেই শৈলীকে নিজের ভাষাতেও ব্যবহারের একটা পথ খুঁজে দিতে। বাংলা ভাষা সেই কবিতাশৈলীকে এবং তার ভাবনাকে কীভাবে ধারণ করবে এবং তা কীভাবে বাংলা কবিতার ভাষাতেও একটা দিক বদল আনবে এগুলো ভাবা জরুরি। কবি শুভঙ্কর দাশের উদাহরণ দেওয়া যায়, যাঁরা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন ও বিকল্প সাহিত্যর খোঁজ রাখেন তাঁরা সবাই চিনতেন তাঁকে, গ্রাফিত্তি পত্রিকা ও প্রকাশনা চালাতেন তিনি। তাঁর সারা জীবনের খোঁজ ছিল কবিতার অন্যধারার লেখকদের বাংলা সাহিত্যে পরিচিত করা, যাতে কবিতার বিভিন্ন নতুন পথ ও পন্থাকে বাংলা সাহিত্য চিনতে পারে, তাকে আপন করে নিতে পারে। নিজে সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানবিরোধী বিকল্প ধারার কবি ফলে তাঁর এই বিদেশী ভাষার কবিতার সঙ্গে একটা আত্মিক যোগ ছিল, যে যোগ তাকে ওই ভাষার সঙ্গে নিজের ভাষাকে মেলাতে সাহায্য করেছে। নাহলে বুকাওস্কি বা ব্রটিগানের মতো লেখকের কবিতার এসেন্স বাংলায় ধরতে এবং পাঠকের বোধগম্য করে তুলতে পারতেন না। যাকে বলে কাব্যিক, গীতিলতাময় (লিরিকাল) ঘোরানো-প্যাচানো কাব্যভাষা, তার থেকে বাংলা কবিতাকে সরিয়ে এনে সরাসরিভাবে গদ্যধর্মী ও নাগরিক, আটপৌঢ়ে থেকে একেবারে নিম্নবর্গীয় স্বরযুক্ত ভাষার কবিতার সন্ধান দরকার ছিল, তার জন্য এই বিদেশী বিকল্প কবিদের বাংলা অনুবাদ প্রয়োজন ছিল। ঠিক যেমন প্রয়োজন ছিল বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসুদের এলিয়ট বা ব্যোদল্যেরকে। আমি নিজেও যখন লিওনার্ড কোহেন-এর কবিতা নিয়ে কাজ করেছি, অথবা হান শান অনুবাদ করছি এখন, স্পষ্ট ধারণা থেকে যে এই কবিতা আমার এবং আমাদের কাব্য ভাষায় নতুন কী যোগ করবে?

কবিতার অনুবাদ করতে বসা মানে আসলে বিস্ফোরক পদার্থ নিয়ে নাড়াচাড়া করা, জীবন্ত উপাদানগুলো একটু এদিক ওদিক হয়ে গেলেই আর বাজবে না মূল কবিতার মতো, ফলে যান্ত্রিকতার কোনো জায়গা এ ক্ষেত্রে অন্তত সম্ভব নয়। তাই এআই দিয়ে কবিতার পুরো কাঠামো হুবহু নকল করা যাবে কিন্ত প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে না। ভাবকে ও ভাষাকে নিজের প্রেক্ষিতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পুনর্জীবন দেওয়ার কাজটা নতুন কবিতা লেখার মতোই এক রূদ্ধশ্বাস সৃজনাত্মক প্রক্রিয়া।

Comments

আরও পড়ুন

গল্প - জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

বীথিকা ধরে হেঁটেছে দীন

সৌমিত ভট্টাচার্য্য