জুজুতন্ত্রের সমূহ শ্বাপদ এবং হুজ্জতি

 

—দেবার্ঘ সেন 


কিছুই চমৎকার হচ্ছে না, কিছুই সার্থক হচ্ছে না। কেমন যেন একটা ম্যাদামারা দিন কাটছে আর দীর্ঘ হচ্ছে তালিকা। নিজেকে প্রশ্ন করছি, নিজেকে খুবলে ধরছি, নিজেকে ক্ষত করছি, নিজেকে নিজেই গ্রেপ্তার করছি সময়ের ব্যভিচারে। এসবের মধ্যে কবিতা পুড়ে যাচ্ছে, জন্মাচ্ছে ছাই, সেই ছাই মেখে বসে আছি, ছাই উজ্জ্বল হচ্ছে, আমাকে চিনিয়ে দিচ্ছে অচৈতন্য নাবালিকা কুয়াশায়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমার নিভৃতি, মুক্তি চাইছে আমার শরীর-শরীর দ্বন্দ্ব, মুক্তি আর ছাই শত্রু হয়ে উঠছে পরস্পর, এভাবেই সংঘর্ষ লাগছে, দড়ি টানাটানি করছে অস্তিত্বের সমস্ত প্রহরী, প্রহরীরা প্রশাসনিক ক্যারাটে খেলছে, দুর্ধর্ষ গতিতে হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে উড়ে আসছে পেরেক, সব চক্রান্তের শিকড়ে রয়েছে বাতাস, বাতাসের হাতে হাতুড়ি, হাতু্ড়ি দিয়ে পেরেক গাঁথছে অনুভূতির মাছি, মাছিরা রাতকানা হলেও দিব্যি ওভারটাইম করছে, এভাবেই আমার অধিকতর কমা বেড়ে যাচ্ছে, তাই এখানে একটা নিরপেক্ষ দাঁড়ির প্রয়োজন।


দাঁড়ি দিলাম। প্রয়োজন দেওয়ালে মাথা ঠুকছে, ঠুকতে ঠুকতে চটিয়ে দিচ্ছে দেওয়াল, দেওয়ালের কানে দুল হয়ে ঝুলছে মানুষ, মানুষের গলা। গলার মধ্য দিয়ে আশ্চর্য শিহরণে আমার ভেতরে প্রবেশ করে যাচ্ছে যন্ত্রণা, ক্রোধ, আতঙ্ক এরকম আরও কতকিছু। ভেতরে ঢুকে ওরা লাফদড়ি খেলছে। এই লাফদড়ি প্রতিযোগিতা আয়োজন করে দিয়ে গঙ্গাজলের প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখতে বলছে রাষ্ট্র। পোকায় কাটা গণতন্ত্রে শুধুই হুল্লোড় চলছে, কেউই কাউকে চিনতে পারছে না। শিয়রের সমস্ত অঞ্চলই নিদ্রাদোষে দুষ্ট। অকুন্ঠ গাঁড় মারতে মারতে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে র বর্গ। উচ্ছ্বাস, এসো তোমাকে এই চেয়ারে বসিয়ে নিয়ে যাই পাহাড়ের চূড়ায়, তারপর পেছনে সজোরে একটা বেমক্কা লাথি মারি, চেয়ার ভেঙে যাক, হয়ে যাক গুঁড়ো গুঁড়ো, আর আপনি আপনার মৃত্যু জেনে পতনকালে হিংসে করুন জলপ্রপাতকে। কিচ্ছু যায় আসে না এসবে। অর্থের অপোহ কুঞ্চনে আপনারা দুর্নীতি চালান। আমরা আমাদের সমস্ত লেখা লিখে যাবো, ইউনিকোডে সংগ্রাম ফন্টে। আর আপনাদের খবর ছাপা হয় যে ফন্টে তার ভালো নাম উৎকোচ, অনুব্রতে যাকে বলে হুজ্জতি। এ কথা সবাই জেনে গেলেও, অস্বীকারের সহজ মদে বুঁদ হয়ে তারা দ্বিখণ্ডিত। শিরশূন্য দাঁড়ায় 'আমার কী' মন্ত্রে চেতনার দেহ রেখে তারা শুধু ঘষামাজা করে চলে সেতু সম্পর্কের ধাতব রেলিং, যদি কোনও অডি- মার্সিডিজের দাক্ষিণ্যলাভ হয়ে যায়।



এই যে চরম বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণাগত মেদ জমছে, যা আড়াল করতে চাইছে অপরাধকে-অপরাধীকে, সেখানেই রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে চেষ্টা চলছে জনরোষকে প্লাস্টার করে দেওয়ার এবং তা আরও ভয়ানকরূপে কালের প্রতিফলন জারি করছে। কিচ্ছু চমৎকার হচ্ছে না, কিচ্ছু সার্থক হচ্ছে না, ভি.পি.এন ব্যবহার করে প্রতিরাতে যুবসমাজ পর্ণসাইটে ঢুকে দেখতে চাইছে, রাষ্ট্র তাকে যতভাবে চুদছে প্রতিদিন তার ভিডিও। অথচ সে ভিডিও নেই, অগত্যা মস্তিষ্ককে অবশ করতে এবং নিজেকে সান্ত্বনা দিতে দেখে নিচ্ছে ব্রুটাল সেক্স হয়তো বা বিডিএসএম, অতঃপর অমূলক ক্রোধের বিন্যাস ছড়িয়ে যাচ্ছে শিরায় শিরায়। প্রভাব ফেলছে বিকৃত কামের মতো নিকৃষ্ট উন্মাদনা। পাশাপাশি সবকিছুই সিভিক হয়ে যাচ্ছে, হয়তো এরকম চলতে থাকলে কোনদিন আমাদেরও করে দেওয়া হবে হোমো সিভিক স্যাপিয়েন্স। আর এভাবেই ফাটল ধরে যাবে চারদিকে, একটা পোকায় কাটা, মৃত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আগেই এই জঞ্জাল সাফ করতে হবে, ছাড়তে হবে মঙ্গলবারের অপেক্ষা। পার্টি সিম্বলকে অগ্রাহ্য করে প্রত্যেককেই হতে হবে রাজনৈতিক সচেতন, আবশ্যিকভাবে নিতে হবে রাষ্ট্রনীতির ন্যূনতম পাঠ। নইলে, কিছুই আর চমৎকার হবে না, কিছুই আর সার্থক হবে না কোনওদিন। রিল্ আর রিল্‌সেই উপুড় হয়ে পড়ে থাকবে ভাতা নির্ভর জীবন, মেয়ের বাবারা তাদের কন্যার সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে নিজেরাই নিজেদের গালে ঠাস ঠাস করে চড় মারবেন যখন ছোট্ট মেয়েটির মুখ থেকে শুনবেন 'বাবা আমার বয়স তো এগারো, ওর তো ছিলো দশ।' কিচ্ছু চমৎকার হচ্ছে না, কিচ্ছু সার্থক হচ্ছে না, ছি এর সাথে কেবল জুড়ে দেওয়া হচ্ছে নালি, রোধ করা হচ্ছে নির্ভীক কন্ঠ আর নন-কর্ডাটা কুণালজীবীতায় প্রশ্রয় পেতে পেতে ঘরে ঘরে ঘনীভূত হচ্ছে একমাত্র আবালসংস্থিতা।

অলংকরণ —নম্রতা বালা


Comments

Anonymous said…
যা বলা হল এর থেকে নিষ্ঠুর সত্য আমরা আশা করি না। আমার সবকিছু কি আমরা নিজেরাই বিক্রি করে দিচ্ছি? আমরা শুধু অ্যাক্সিডেন্টে মরলেই কেনো দুঃখ প্রকাশ করব, প্রতিদিন যে মরছি নিজেদের দোষে এটাই তো বড়ো দুঃখের।

আরও পড়ুন

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ৩

তৃতীয়— মাস-সংক্রান্ত

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ২

সাম্য রাইয়ান— নির্বাচিত একক সংখ্যা

রঙ্গন রায়

সিনেমা-বিষয়ক নিবন্ধ -- জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

একটি কবিতা সিরিজ —

গুচ্ছ কবিতা —

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ১