অনুবাদ —







একজন অনুবাদক যখন একটা বিষয় ভাবানুবাদ করেন তখন তিনি আসলে টেস্কট নয়, অনুবাদ করেন একটা সংস্কৃতি। অনুবাদ করেন মাটি। তার রস। তিনি অনুবাদ করেন সেই সংস্কৃতির হাওয়া, জলবিন্দু আর ভেসে যাওয়া ফুলের রেণু। অনুবাদ করেন অন্দরমহল আর লুকোনো বারান্দা। যে বারান্দা সেই সংস্কৃতির, সেই ভাষাভাষি মানুষের বুকের ভেতর থাকে। একজন অনুবাদকের কাজ গোয়েন্দার মতো সেই বারান্দাকে খুঁজে বের করা আর হাওয়ায় হাওয়ায় তার অস্তিত্ত্ব, তার সুবাসকে ছড়িয়ে দেওয়া দূর থেকে দূরে। 

হয়তো তাই, Rainer Schulte বলেছিলেন, ‘Translators never come to rest; they are constantly in two places at the same time by building associations that carry the foreign into the known of their own language.’ 

অনুবাদক হিসেবে আমিও এ চেষ্টাই শুধু করেছি। হয়তো প্রত্যেকবার সফল হইনি। পড়ে গেছি। কিন্তু আবার উঠে দাঁড়িয়ে চেষ্টা করেছি যে ভাষার অনুবাদ করছি তার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠার।   

এ প্রসঙ্গে কয়েকটা কথা বলি। একজন প্রকৃত অনুবাদকের কাছে তিনটে জিনিস থাকা প্রয়োজন। এক, মায়ের হৃদয়, দুই, ম্যাজিশিয়ানের উত্তরীয় আর তিন, অদম্য খিদে। এই তিনটে বিষয় একজন অনুবাদককে অন্য একজন অনুবাদক থেকে আলাদা করে। 

অনুবাদক হিসেবে আমি যে সামান্য কয়েকটা কাজ করেছি, সেসব করতে গিয়ে এ বিষয়গুলো ভীষণভাবে অনুভব করেছিলাম। আজও করি। 

সেই অনুভব আর ভাবনা থেকেই এই অনুবাদ কাজ। মনে হয়েছিল সাম্প্রতিককালে কেমন কবিতা লেখা হচ্ছে উজবেকিস্তানে, সেটা দেখা দরকার। বোঝা প্রয়োজন। তাই এ প্রচেষ্টা। বাঙালি পাঠক যদি পড়েন, তবে এই পরিশ্রম সার্থক হবে। 



















ওবলোকুলোভা দিলাফ্রুজ কবি, সাংবাদিক। উজবেকিস্তানের বুখারা অঞ্চলের পেশকু জেলার কুমকুরগান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  "স্টুডেন্ট অফ দ্য ইয়ার-২০২২" রিপাবলিকান প্রতিযোগিতার বিজয়ী ওবলোকুলোভা দিলাফ্রুজ বর্তমানে বুখারা অঞ্চলের সংস্কৃতি বিভাগের ডিজিটাইজেশন এবং প্রেস সার্ভিসের প্রধান বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করছেন। উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি শাভকাত মির্জিওয়েভের ডিক্রি অনুসারে, তাঁকে "ভবিষ্যতের নির্মাতা" রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল। তিনি প্রজাতন্ত্রের তরুণ শিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী "জোমিন সেমিনারে" অংশ নিয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ওবলোকুলোভা দিলাফ্রুজ কবি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনে।


(১)

স্লোগান


বচন বহু অর্থবোধক, আবার প্রজ্ঞার আলো আছে তার গায়ে

দৃষ্টি  দীপ্তি ছড়ায়, আবার মাঝে মাঝে তাতে থাকে ত্রুটিদাগ

হে আত্মা, কাকে বেছে নেবে তুমি?

কোনও মানুষকে যদি প্রকৃত জানতে চাও, 

তবে তোমাকে নাভয়ের বই পড়তে হবে। 


কেউ অপার স্বাধীন, কেউ দিকভ্রান্ত

কী আশীর্বাদ আর কোনটা অভিশাপ? 

এক জাতির জন্য সত্যিই কোনটা কতটা ভালো?

এ পৃথিবীকে যদি সত্যিই ছুঁতে চাও 

তবে তোমাকে নাভয়ের বই পড়তে হবে।


তুমি যদি তোমার জাতিকে স্বাধীনতা বোঝাতে চাও,

হে স্বজন, প্রার্থনার জন্য হাত প্রসারিত করো

তুমি যদি নিজেকে পরিপূর্ণ করতে চাও

বারবার বলি, 

তোমাকে নাভয়ের বই পড়তে হবে।

নাভয়ের বই পড়তে হবে।


(২)

চিরন্তন বুখারা


পৃথিবীর গলায় তুমি  আমার তাবিজ সম দাগ,

আমার স্বীকারোক্তি তুমি, আমার বিশ্বাস তুমি, তুমিই অভিব্যক্তি,

তুমি আমার সখা, জীবন ও আমার কবিতা।

এ পৃথিবীর

মুক্তো ও সৌন্দর্য বুখারা,

গম্বুজের শহর এ মনোরম দেশ,

আর্ক দুর্গের  প্রজ্জ্বলিত ইতিহাস নিয়ে জেগে আছে আজও

বুখারা সেই সুর যা অহরহ বাজে আত্মায় 

বাজে  প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের প্রজ্ঞায়...

 

কল্যাণ মিনার, কল্যাণ মসজিদ,

সারা বিশ্বকে অবাক করে আজও 

এ পুরাণের শহর, পৃথিবীর স্বর্গ, বুখারা 

জেগে আছে, 

ধার্মিকের চোখে মুক্তো হয়ে


লাবি খোভুজ এক দৃষ্টি ঝিলিক,

অ্যাভিসেনা  ওষুধ শাস্ত্র নবাব

সিতোরাই মুখি-খোসা সেই সৌন্দর্যের গল্প নিয়ে

জেগে আছে, জেগে আছে

দুই আকাশের মাঝে বুখারা


সাত জ্ঞানী পুরুষ সেই সপ্ত ঋষি,

তারাই তো ধর্মের গুরু

আমাদের আত্মায় কৃতজ্ঞতা, প্রার্থনা পূর্ণ করে,

পৃথিবীর বুকে আজও প্রজ্জ্বলিত এই বুখারা


তুমি মা, তুমিই শিক্ষক,

তুমি বিজ্ঞানের সুপ্রাচীন ইতিহাস

এ জীবন লুটাই ওগো তোমার পায়ে

এ পৃথিবীর মণি এ অপরূপ  বুখারায় !
















মাহজুনা হাবিবোভা বুখারা অঞ্চলের জোন্দর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। মাহজুনা মন:স্তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। উজবেকিস্তানে তিনি এক উজ্জ্বল কবি ও অনুবাদক। তাঁর কবিতার বই উজবেকিস্থানে সমাদর পেয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পত্রিকাতেও। সম্প্রতি তিনি 2024 - "জোমিন" সেমিনারের রিপাবলিকান মঞ্চের অংশগ্রহণ করেছেন এবং সমাদৃত হয়েছেন।

(১)
আমার দেশ আমার হৃদয়ে...

যদি তুমি ধ্বংস হয়ে যাও - আমি দু:খী হব না
তোমার ইতিহাস স্মৃতির ভিতরে উজ্জ্বল থাকবে চিরটা কাল
তোমার বাহুতে আমার সঙ্গীত, আমার বাণী বিজয়,
তুমিই আমার পথ্য আরাম

আমার মূল্যবোধকে ছাড়িয়ে যায় তোমার উচ্চতা-
 সমগ্র বিশ্ব একটাই পৃথিবী যেন...

আলো হও, আমার দেশ, আমার শরীর নিয়ে গেড়ুয়া আলো পড়ুক
দরিদ্রের শীর্ণ হাতে

যদি তোমাকে বলা হয় আকাঙ্খা নিয়ে মরতে
বাবরের মতো-
'দোদি' ছিল যার মুখের ভাষা...

তবে তুমি, কলম দিয়ে এ বিশ্ব জয় কোরো
কলমে যে বিশ্ব জয় করেছে,
তার প্রার্থনা কখনও ম্লান হয় না এ ধরণীতে

যত্ন নাও, যত্ন নাও,স্বাধীনতাকে রক্ষা কর,
জেনে রেখো, আমার তরবারির শিকার হবে পশুরা
বুকের চারপাশে জমাট হবে রক্তদাগ
গর্বকে রক্ষা কর, রক্ষা কর জোৎস্না রাগ

হৃদয়ে শব্দ রাখো - আঁকড়ে ধর ব্যথা,
বুঁদ থাকো স্বাধীনতায়
যতক্ষণ না আমি নিজেকে তোমার কোলে বপন করি চিরতরে 
যতক্ষণ না আমি তোমার বাহুতে নিজের ভাগ্য খুঁজি ...

Comments

আরও পড়ুন

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ৩

তৃতীয়— মাস-সংক্রান্ত

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ২

জুজুতন্ত্রের সমূহ শ্বাপদ এবং হুজ্জতি

সাম্য রাইয়ান— নির্বাচিত একক সংখ্যা

রঙ্গন রায়

সিনেমা-বিষয়ক নিবন্ধ -- জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

একটি কবিতা সিরিজ —

গুচ্ছ কবিতা —

“মহানগর” - ধীমান ব্রহ্মচারী | পর্ব ১