অনুবাদ সংখ্যা - মোহনা মজুমদার
"তোমার ভেতরে একটা অনুক্ত গল্প বহন করার চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর কিছু নেই।"
আদ্যন্ত একজন কবিই বোধহয় এভাবে আত্মদগ্ধ দর্শন উচ্চারণ করতে পারেন। কিন্তু শুধুই কি তিনি কবি? 'মায়া অ্যাঞ্জেলো' নামটি প্রথম শুনেছিলাম এক অগ্রজের কাছে। মিতভাষী সেই মানুষটি বলেছিলেন 'মায়া অ্যাঞ্জেলো' পড়ো, আশা করি ভাল লাগবে, লড়াই করার শক্তি পাবে। সেই প্রথম 'মায়া অ্যাঞ্জেলো' নামটির সঙ্গে আমার পরিচয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে জানতে গিয়ে জেনেছিলাম তিনি একজন আমেরিকান কবি,সঙ্গীত শিল্পী, আত্মজীবনী লেখিকা এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের একজন কর্মী। ধীরে ধীরে তাকে পড়তে পড়তে অনুধাবন করি তার লেখা মূলত বর্ণবাদ এবং মানসিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবার কথা বলে। জীবন সংগ্রামের কঠিন পরিস্থিতিতে স্থিতিস্থাপকতার কথা, আত্মমর্যাদার কথা স্বাক্ষরিত করে গেছেন তিনি তাঁর লেখায়। ১৯২৮ সালে আমেরিকার মিসৌরিতে জন্মেছিলেন ‘আই নো হোয়াই দ্য কেজ্ড বার্ড সিংস’-এর স্রষ্টা মায়া অ্যাঞ্জেলো। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার রক্ষা আন্দোলনে এক সময়ে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং ম্যালকম এক্সের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন এই কবি। তাই কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের কাছে মায়া অ্যাঞ্জেলো এক বড় আশ্রয়। লেখার মধ্য দিয়ে মায়া অ্যাঞ্জেলো আমেরিকায় বেড়ে ওঠা প্রতিটি কৃষ্ণাঙ্গ নারীর প্রতীকী চরিত্র হিসেবে নিজেকে এঁকেছেন। বর্ণবাদের শিকার আর হীনমন্যতার জটিলতা ছিল যার নিত্যসঙ্গী। সেই চরম দুর্দশা থেকে ধীরে ধীরে আত্মসচেতন ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অধিকারী এক নারীতে পরিণত হন তিনি। সারা জীবন মাতৃত্ব উদ্যাপন, বর্ণবাদের সমালোচনা, পরিবারের গুরুত্ব, ভালোবাসায় মুক্তির অনুসন্ধান, ব্যক্তি মর্যাদা ও জ্ঞানের গূঢ় অনুসন্ধান চালিয়েছেন মায়া অ্যাঞ্জেলো। জীবন ও শিল্প দুটি ক্ষেত্রেই তাঁর ঋজু বিচরণ আমাদের অবাক করে।
শব্দ, বাকপ্রতিমা অথবা পাথর , ব্রোঞ্জ বা রং - তা সে শিল্পের যে ফর্মই হোক না কেন , শিল্পী কি তবে সেই অদম্য অবয়বের ভেতর তার ব্যক্তিগত জীবনের আলোছায়া নিজের অজান্তেই তুলে ধরতে চান? এরকম একরৈখিকতায় 'মায়া অ্যাঞ্জেলো'কে ধরা যায় না। ২০১১ সালে সে সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছ থেকে সে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ পান মায়া। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনীমূলক শেষ বই ‘মম অ্যান্ড মি অ্যান্ড মম’। ২০১৪ সালে মৃত্যু হয় তাঁর।
(১) তবুও আমি জেগে উঠি
তুমি আমাকে ইতিহাসে লিখে রাখতে পারোতোমার তিক্ত, বিকৃত মিথ্যা দিয়ে তুমি আমাকে
কিন্তু তবুও, ধুলোর মতো, আমি জেগে উঠব।
আমার বোকামি কি তোমাকে বিরক্ত করে?
তুমি কেন বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন?
কারণ আমি এমনভাবে হাঁটি যেন আমার
ঠিক চাঁদ-সূর্যের মতো,
নিশ্চিত জোয়ার ভাটার মতো,
ঠিক যেমন আশা জেগে ওঠে,
আমিও তেমনি উঠবোই।
তুমি কি আমাকে ভেঙে পড়তে দেখতে চেয়েছিলে?
কাঁধগুলো অশ্রুবিন্দুর মতো ঝরে পড়ছে,
আমার প্রাণোচ্ছল কান্নায় দুর্বল হয়ে পড়ছে ?
আমার অহংকার কি তোমাকে বিরক্ত করে?
তুমি কি এটাকে খুব কঠিনভাবে নিচ্ছ না?
কারণ আমি এমনভাবে হাসি যেন আমার
তুমি তোমার কথা দিয়ে আমাকে গুলি করতে পারো,
তুমি তোমার চোখ দিয়ে আমাকে কেটে ফেলতে পারো,
তুমি তোমার ঘৃণা দিয়ে আমাকে মেরে ফেলতে পারো,
তবুও, বাতাসের মতো, আমি জেগে উঠবো।
আমার যৌনতা কি তোমাকে বিরক্ত করে?
এটা কি অবাক করার মতো?
আমি এমনভাবে নাচছি যেন আমার কাছে
ইতিহাসের লজ্জার কুঁড়েঘর থেকে বেরিয়ে আমি জেগে উঠি
বেদনার মূলে থাকা অতীত থেকে উঠে আসি
আমি জেগে উঠি
আমি একটি কালো সমুদ্র, লাফিয়ে লাফিয়ে উঠি,
ভয় আর আতঙ্কের রাতগুলো পেছনে ফেলে আমি জেগে উঠি
একটি আশ্চর্যজনক স্পষ্ট ভোরের দিকে আমি জেগে উঠি
আমার পূর্বপুরুষদের দেওয়া উপহারগুলো নিয়ে,
আমি জেগে উঠি
আমি জেগে উঠি
আমি জেগে উঠি।
(২) একটি জর্জরিত যাত্রা
দরজায় না আছে কোনও সতর্কীকরণ শব্দ
না আছে ভারী পায়ের শব্দ
যা প্রবেশপথের বোর্ডগুলোকে ধাক্কা দিয়ে
অন্ধকার কারাগারে নিরাপদে বন্দী থেকে
আমি জানি যে পাকিস্তানের একজন দন্তবিহীন
এক অদৃশ্য সময়ের সুখী ছাপ আলোকিত হয়।
আমার মুখ কঠিন বাতাসকে
প্রত্যাখ্যান করে এবং ফুসফুস তা ধরে রাখে।
আমার ঘরে সে দরজার প্যাডিং ভেদ করে চাবির ছিদ্র
ভয়ের একটা হাড় আমার গলায় আটকে আছে
আমার মন, পূর্বে হয়তো শান্ত ছিল —
তাদের আনন্দময় মুখগুলো দেখার জন্য,
এমনকি আমার ভেতরেও প্রবেশ করার জন্য ব্যাকুল।
আমাকে ‘নিজের বাইরে’ আলো বসাতে এবং
সমস্ত উজ্জ্বল সময়ে আমি প্রত্যাশায় আঁকড়ে থাকি,
যতক্ষণ না অন্ধকার আমাকে নিজের করে নেয়।
দিন চলে যায় তার অপূরণীয় জায়গায়
এবং আমি আবার পরিচিত হতাশার বন্ধনে নিক্ষিপ্ত হই।
বিষণ্ণতা আমার পায়ের আঙ্গুলের মাঝখানে,
আর আমার চুলের গোড়াগুলো চুষছে।
এটা আমার আশার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়াকে ক্ষমা করে দেয়।
আমি আবারও তার লোভী বাহুবন্ধনে আটকে পড়ি।
কবিতাটিতে দেখা যায় , আশা ও নিরাপত্তার মোড়কে একটি যাত্রা শুরু হলেও শিঘ্রই একটি অজানা ভয় কবিকে ঘিরে ফেলে। এই যে শেষ স্তবকে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিষন্নতা কিভাবে কবির পায়ের আঙ্গুল, গোড়ালি, চুলের গোড়া সর্বত্র ঘিরে ধরেছে। কবি এখানে অন্ধকার কালটিভেট করছেন , তার দেওয়াল চুরমার করে আলোর অন্তঃস্বর শুনতে চাইছেন । এবং সেই কারনে শেষ পংক্তিতে বিষন্নতার শুশ্রূষা হিসেবে তিনি আবারও 'আশা'র আলিঙ্গনে আবদ্ধ হতে চাইছেন।
(৩) একা
মিথ্যা বলছি, ভাবছি
গত রাতে
আমার আত্মার জন্য কীভাবে একটি বাসস্থান খুঁজে পাবে
যেখানে জল তৃষ্ণার্ত নয়
এবং রুটি পাথরের মতো নয়
আমি একটা জিনিস বুঝেছি
আর আমি বিশ্বাস করি না যে আমি কোনো ভুল করছি ,
কিন্তু কেউ এখান থেকে একা বের হতে পারবে না।
একা, একেবারে একা
কেউ না, কিন্তু কেউ না একা
এখান থেকে বের হতে পারবে না
কিছু কোটিপতি আছে
যারা তাদের টাকা ব্যবহার করতে পারে না
তাদের স্ত্রীরা বাঁশির মতো দৌড়াদৌড়ি করে
তাদের বাচ্চারা ব্লুজ গায়
তাদের পাথরের হৃদয় সারানোর জন্য
তাদের দামি ডাক্তার আছে
কিন্তু কেউ না, কেউ না
এখান থেকে একা বের হতে পারবে না।
একা, একেবারে একা
কেউ না, কিন্তু কেউ না
একা এখান থেকে বের হতে পারবে না।
এখন যদি তুমি মনোযোগ দিয়ে শোনো
আমি তোমাকে যা জানি তা বলব
ঝড়ের মেঘ জড়ো হচ্ছে
বাতাস বইবে
মানুষের জাতি কষ্ট পাচ্ছে
আর আমি আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি,
'কারণ কেউ, কিন্তু কেউ
একা এখান থেকে বের হতে পারবে না।'
একা, একেবারে একা কেউ না,
কিন্তু কেউ না একা
এখান থেকে বের হতে পারবে না।
প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের লড়াই ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু যার যা লড়াই তাকে তা একাই লড়তে হয়। কবিও বহু সময় কঠিনের আন্তঃ সাধনায় একা সময় কাটিয়েছেন। উপরের কবিতাটিতে আমরা দেখতে পাই, মায়া কীভাবে জীবনের অস্তিত্বের লড়াই কবিতার আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনিই হয়ে উঠেছেন কবিতাটির প্রটাগনিস্ট। উঠে এসেছে জাতিগত, সামাজিক অবিচারের চিত্র, বিচ্ছিন্নতা , দারিদ্র্যতা। কবি তাঁর নিজস্ব ব্যাক্তিগত জীবনে যা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সেগুলোই এক একটি তরঙ্গের বিন্যাস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তার সৃষ্টির যাপনে।
(৪) বার্ধক্যের উপর
যখন তুমি আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখো,
ভেবো না যে আমার সঙ্গে তোমার বকবক
আমি নিজের কথা শুনছি।
থামো! থামো! আমার প্রতি করুণা করো না! থামো!
বুঝছো যদি তুমি এটা বুঝতে পারো, নইলে
যখন আমার হাড় শক্ত এবং ব্যথা করে,
এবং আমার পা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারে না,
আমি কেবল একটি অনুগ্রহ চাইব:
আমাকে কোন রকিং চেয়ারে আনিও না।
যখন তুমি আমাকে হাঁটতে, হোঁচট খেতে দেখো,
কারণ ক্লান্ত মানে অলসতা নয়
আর প্রতিটি বিদায় কখনও শেষ হয়ে যায় না।
একটু কম চুল, একটু কম থুতনি,
অনেক কম ফুসফুস এবং অনেক কম বাতাস।
কিন্তু আমি কি ভাগ্যবান নই যে আমি এখনও শ্বাস নিতে পারছি।
কবি যখন বার্ধক্যের কাছাকাছি পৌছচ্ছেন, তিনি অনুভব করছেন বয়স হলে মানুষ কতোটা একাকী, করুণ এবং অসহায় হয়ে পড়েন। তরুন পাঠকের কাছে তাই তিনি অবমাননার পরিবর্তে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করেন। বার্ধক্যের স্টেরিওটাইপের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানে এই কবিতা। তিনি এই প্রৌঢ় বয়সে পৌঁছেও কারোর কাছে সঙ্গ ভিক্ষে চান না, করুণা চান না। বরং জীবনের কাছে আরো বেশী থ্যাঙ্কফুল থাকতে চান, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। জীবনের প্রতি এই কৃতজ্ঞতাবোধ, বলিষ্ঠ ভাষণ পাঠককে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায় ।
(৫) সকালের স্পন্দনে
একটি পাথর, একটি নদী, একটি গাছ
অনেক আগে চলে যাওয়া প্রজাতির আবাসস্থল,
ডাইনোসর, যে শুকনো চিহ্ন রেখে গেছে
এখানে তাদের অবস্থানের কথা
আমাদের গ্রহের মাটিতে,
তাদের দ্রুতগতির ধ্বংসের যেকোনো বিস্তৃত সতর্কতা
ধুলো এবং যুগের অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
কিন্তু আজ, শিলা আমাদের স্পষ্টভাবে,
জোরে চিৎকার করে বলছে, এসো,
তোমরা আমার পিঠে দাঁড়াতে পারো এবং
আমি তোমাদের এখানে কোন লুকানোর জায়গা দেব না।
তুমি, যাকে দেবদূতের তুলনায়
কষ্টকর অন্ধকারে সে অনেকক্ষণ ধরে শুয়ে আছে,
তোমার মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে,
যেন হত্যার জন্য সে অস্ত্রধারণকারী ।
আজ পাথর আমাদের ডাকছে,
তোমরা আমার উপর দাঁড়াতে পারো,
কিন্তু মুখ লুকিও না।
১৯৯৩ সালে, রবার্ট ফ্রস্টের পর তিনিই দ্বিতীয় কবি যিনি রাষ্ট্রপতি ক্লিনটনের অভিষেক অনুষ্ঠানে নিজের লেখা এই কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। এই কবিতাটি আমেরিকান জনগণের জন্য ঐক্য ও শান্তির এক নতুন ভোরের প্রতীক। কবিতাটিতে 'মাস্তোডন' , 'ডাইনোসর' ইত্যাদি শব্দব্যাবহার করে এক ভিন্ন ধারার চিত্রকল্প রচনা করেছেন। উক্ত কবিতাটির মাধ্যমে অ্যাঞ্জেলোর আশাবাদী বার্তা, ক্লিনটনের বক্তৃতার মূল বিষয়বস্তুর প্রতিধ্বনি হয়ে উঠেছিল এবং সামাজিক সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়েছিল। শ্রোতাদেরকে শান্তি ও ঐক্যের একটি সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি আরও উন্মুক্ত হতে বলেছিল। একই সাথে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টিপাত করতে বাধ্য করেছিল কবিতাটি। ভাঙনধরা ক্ষয়ে যাওয়া সত্তার প্রেরণা হিসেবে তিনি আজীবন থেকেছেন সব্যসাচীর মতো দৃঢ়, আত্মপ্রত্যয়ী। আমরা যারা বেঁচেও মরে আছি; কবি তার জীবন দিয়ে, লেখনী দিয়ে নতুন পথে বেঁচে থাকার ফুলকি গুলো উশকে দিয়ে গেলেন।

Comments